দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং চলমান সংকট মোকাবিলায় এ মন্ত্রণালয় সরাসরি তদারক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে স্থিতিশীলতা আনা, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় সমস্যা আরও ঘনীভূত হওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর দফতর পরিবর্তনের গুঞ্জনও উঠেছে। এমন গুঞ্জনের প্রেক্ষিতেই মন্ত্রী সবশেষ সংসদীয় দলের বৈঠকেও অংশ নেননি। তিনি বর্তমানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তবে মন্ত্রীর দফতর পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। কোথাও লোডশেডিং, কোথাও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, আবার কোথাও শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়, আমদানি করা বিদ্যুতের মূল্য, জ্বালানি আমদানি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখতেই প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তদারকির উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি একটি সংসদীয় দলের সভায় যোগ দেননি বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রীর দফতর পরিবর্তন হতে পারে এবং সংসদীয় দলের সভায় তোপের মুখে পড়তে পারেন এমন গুঞ্জন ছিল। তার পরিবর্তে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সভায় সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের উত্তর দেন।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দেশের অর্থনীতি এবং নাগরিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে গ্যাসের সংকট দেখা দিলে বাসাবাড়িতে রান্না থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প-কারখানার উৎপাদন পর্যন্ত ব্যাহত হয়। ফলে এ খাতের সমস্যা শুধু একটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের বিষয় নয়, এর সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবন জড়িত। এ কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ, বিতরণ এবং ব্যবস্থাপনার প্রতিটি স্তরে নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তদারকির দায়িত্ব নিজের হাতে নিলে সেটা খুব ভালো হবে।
মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, গ্যাস স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে সরবরাহ না কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব খাতে সমন্বয় করা হচ্ছে। এ ছাড়া পায়রা ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট বন্ধ থাকায় এবং আদানি থেকে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সংকট বেড়েছে। এলএনজি সরবরাহে এফএসআরইউ ত্রুটিরও প্রভাব পড়েছে। তবে পরিস্থিতির ৮৮ শতাংশ সমাধান হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। গ্যাসের সরবরাহে সংকট হলে তার প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমলে লোডশেডিং বাড়ে এবং এর প্রভাব পড়ে শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। ফলে সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট বিএনপির সরকারের সৃষ্ট নয়। বিগত সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লুণ্ঠন চালিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। আর এ খাতকে আমদানিনির্ভর করে তোলায় আজকের এ সংকট। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। তবে বর্তমান সংকট ঘনীভূত হওয়ার পেছনে মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এই দায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর ওপরই বর্তায়। তবে তারা চেষ্টা করছেন, শিগগিরই হয়তো সংকট কেটে যাবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুরো বিষয়টি জানেন এবং দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এখন মন্ত্রীর দফতর পরিবর্তন হবে কি না সেটা প্রধানমন্ত্রীই ভালো জানেন।
প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার থেকে শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও কাশিজনিত সমস্যা নিয়ে রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা