সাড়ে ৬ মাসের বিএনপি সরকার এমনিতেই বিভিন্ন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এরইমধ্যে আগামীকাল বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের ডাকা লংমার্চের মতো বড় কর্মসূচি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সরকার গঠনের ৬ মাসের মাথায় এত দ্রুত জামায়াতে ইসলামী জোটের লংমার্চের কর্মসূচি সরকার ও সরকারি দল বিএনপির মনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নানা প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে। যদিও জামায়াতসহ অন্যবিরোধীরা মনে করছেন সরকারকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এই লংমার্চের মধ্য দিয়ে বিরোধীরা তাদের জনমত ও সাংগঠনিক শক্তিমত্তা দেখাতে চায়। জবাবে সরকার ইতিবাচকভাবে তা মোকাবিলা করতে চায়। জামায়াতের এই কর্মসূচিতে তৃতীয় পক্ষের কোনো সম্পৃক্ততা থাকে কিনা, সেই সন্দেহ দূর করতে সরকারের চোখ থাকবে পর্যবেক্ষণে।
ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে লংমার্চ দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুরে, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনায় এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে লংমার্চ হবে। আর ঢাকা মহাসমাবেশ হবে আগামী ১৪ নভেম্বর। তাদের মৌলিক দাবি হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। এ ছাড়া ‘জ্বালানি তেল ও গ্যাস-সংকট, বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল ও মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির’ প্রতিবাদে এই কর্মসূচি পালন করা হবে।
কর্মসূচি প্রসঙ্গে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সময়ের আলোকে বলেন, বিরোধী দলে থাকলে বোঝা যায় কখন কোন সময়ে কী কর্মসূচি দিতে হয়। এটাই পলিটিক্যাল কেমিস্ট্রি। আমরা মনে করেছি এটাই যথেষ্ট সময় লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করার। আর এই লংমার্চ ডাকার আগে আমরা তিন স্তরের কর্মসূচি পালন করেছি। সরকারের উচিত আমাদের দাবিগুলো আমলে নেওয়া। গণভোট বাস্তবায়নে শুভঙ্করের ফাঁকি দেখানো হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লংমার্চের কারণে সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো অবনতি হবে না বলে মনে করি। বিরোধী দলের এমন কর্মসূচি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সৌন্দর্য। বল এখন সরকারের কোর্টে। তারা চাইলেই সলিড শট খেলতে পারে। সরকার দাবি না মানলে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১১ দলীয় ঐক্যের শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সহসভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান সময়ের আলোকে বলেন, আমি মনে করি লংমার্চ কর্মসূচি আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। যেদিন বিএনপি সরকার শপথ নিল ওইদিনই তাদের পতনের দাবিতে সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল। কারণ তারা শপথ গ্রহণের দিনই বেইমানি করছে। বেইমানি দিয়েই সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তীব্র হয়েছে। সবকিছু চিন্তা করে আমরা লংমার্চ দিয়েছি। ঢাকায় মহাসমাবেশ থেকে নতুন কর্মসূচি আসবে।
আরেক শরিক লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন করছি না। জনগণের পক্ষে সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করছি। গণভোটের রায় কার্যকরের জন্য আন্দোলন করছি। যেটি বিএনপি নিজেও নির্বাচনের আগে বাস্তবায়নের কথা বলেছে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে গণবিরোধী চিন্তা করছে। সংকটের মধ্যেও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। এসবের প্রতিবাদ করছে ১১ দলীয় জোট। বিরোধী দল হিসেবে এটাই আমাদের কাজ।
তিনি জানান, শনিবার ঢাকা টু চট্টগ্রাম লংমার্চে চারটা পথসভা, দুইটা সমাবেশ হবে। শুরুতে সকাল ৮টায় ঢাকার শাপলা চত্বরে, আর সমাপনী হবে রাত ৯টায় চট্টগ্রাম নগরীতে। শুরুতে ঢাকায় দুই লাখ মানুষের সমাগম হবে বলে তাদের আশা।
জ্বালানি সংকটের মধ্য গ্যাস-তেল ব্যবহার করে বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচি অবিবেচনাপ্রসূত ও গণবিরোধী বলে মনে করেন বিএনপির যুগ্মমহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে বিরোধীদলের এই কর্মসূচি প্রত্যাহার করা উচিত। এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, চলমান জ্বালানি সংকটের জন্য ৬ মাস বয়সি বিএনপি সরকার কোনোভাবেই দায়ী নয়। বৈশ্বিক সংকট ও মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা এবং এই সেক্টরে আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাট ও ভ্রান্তনীতিতে গ্যাসের স্বল্পতা ও জ্বালানি সংকটের ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোনো অজুহাত দিয়ে বিএনপি সরকার সমস্যা আড়াল করছে না।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপি ও সরকারের তরফ থেকে কোনো ইচ্ছে নেই জামায়াতের লংমার্চে বাধা দেওয়ার। পর্যাপ্ত সহযোগিতা করা হবে তাদের। কিন্তু জামায়াতের এই কর্মসূচিতে পতিত আওয়ামী লীগ যুক্ত হয় কি না তাতে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। জনগণ তা পর্যবেক্ষণ করবে। কেননা সাড়ে ৬ মাসের সরকারের বিরুদ্ধে লংমার্চের মতো বড় কর্মসূচি দেওয়া সন্দেহজনক। এই কর্মসূচির মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে কিনা তাও দেখা দরকার।
সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী সময়ের আলোকে বলেন, এমনিতেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুখকর নয়, এরমধ্যে জামায়াতে ইসলামী লংমার্চ ডাকল। জায়গায় জায়গায় বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বেশি হট্টগোল হবে। এই কর্মসূচি ঘিরে পরিস্থিতি যাতে ঘোলাটে না হয় সেদিকে নজর থাকবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার জায়গা থেকে সার্বিক দিক বিবেচনায় ব্যবস্থা নেবেন, যেন জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এমপি সময়ের আলোকে বলেন, আমরা কেন বাধা দিতে যাব? বাধা দেওয়া নীতিসম্মত নয়। বাধা দিলে বিরোধীদলের শক্তি আরও বেড়ে যাবে। আমার চিন্তা হলো, তারা এমনিতেই দৌড়াতে দৌড়াতে কাহিল হয়ে পড়বে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা