স্থানীয় সরকারের সাড়ে চার হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান এখন নির্বাচন উপযোগী। চলতি সেপ্টেম্বরেই এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের তফসিল দেওয়ার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নভেম্বর থেকে ভোট শুরু করার প্রস্তুতিও নিচ্ছে কমিশন।
তবে একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানে ভোট আয়োজন করতে গিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে সংস্থাটিকে। আবহাওয়া, পাবলিক পরীক্ষা ও ধর্মীয় উৎসবের কারণে টানা ভোট আয়োজনের সুযোগ সীমিত। এর সঙ্গে ফেব্রুয়ারিতে পবিত্র রমজান এবং এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত বন্যা ও বর্ষার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ২০২৭ সালজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চললেও সব নির্বাচন শেষ করা যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে খোদ নির্বাচন কমিশনেরই।
ইসির মতে, নির্বাচনের জন্য নভেম্বর থেকে মার্চ— এই পাঁচ মাস সবচেয়ে উপযুক্ত। এর মধ্যে নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিকে বিশেষভাবে ভালো সময় হিসেবে বিবেচনা করছে কমিশন। ফেব্রুয়ারিতে রমজান থাকায় এ সময়ে ভোট না করার পরিকল্পনা রয়েছে। মার্চের শেষদিকে পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে কিছু নির্বাচন করা যেতে পারে। এরপর শুরু হবে ঝড়, বন্যা ও বর্ষার মৌসুম।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ৪৯৭টি। এর মধ্যে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩১টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা পরিষদ, ৫০৩টি উপজেলা পরিষদ ও ৪ হাজার ৫৮৬টি ইউনিয়ন পরিষদ। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই এখন নির্বাচন উপযোগী।
ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় শাখা-৩-এর তৈরি ইউনিয়ন পরিষদের রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরের আগে ২৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হয়। ওই অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৮১টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মামলা, সীমানা-সংক্রান্ত জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন হয়নি।
নতুন গঠিত আটটি ইউনিয়নসহ দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ ৪ হাজার ৫৮৬টি। এর মধ্যে চলতি বছরই ৩ হাজার ৯৮১টি ইউপি নির্বাচন উপযোগী হবে। বাকি ইউনিয়নগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।
পৌরসভার রোডম্যাপ অনুযায়ী ৩৩১টি পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি নির্বাচন উপযোগী। আইনি জটিলতার কারণে ১১টি পৌরসভা এখনও নির্বাচন উপযোগী নয়। নতুন পাঁচটি উপজেলাসহ দেশে মোট উপজেলা ৫০৩টি। কোনো উপজেলাতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সবই নির্বাচন উপযোগী। নতুন সিটি করপোরেশন বগুড়াসহ ১৩টি সিটি করপোরেশনেরও কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। ফলে সবই নির্বাচন আয়োজনের উপযোগিতা রয়েছে।
নভেম্বরে ভোট শুরু হলে কমিশনকে প্রায় ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদ, ৩২০টি পৌরসভা, ৫০৩টি উপজেলা পরিষদ, ৬৪টি জেলা পরিষদ ও ১৩টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। প্রতিটি ধাপে ভোটের আগে মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই, প্রত্যাহার, আপিল শুনানি ও প্রচার-প্রচারণার জন্য ৩৯ থেকে ৪৪ দিন সময় প্রয়োজন হবে।
প্রতি ধাপে ২৫০ থেকে ৩০০টি প্রতিষ্ঠানে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। অতীতেও কয়েক ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবারও একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে চায় ইসি। তবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে ধাপ ও সময় নির্ধারণ করা হবে। হাওড়, চরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকা, বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, আবহাওয়া, পাবলিক পরীক্ষা এবং ধর্মীয় উৎসব— সবকিছুই থাকবে কমিশনের বিবেচনায়।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আমাদের সব প্রস্তুতি আছে। আমরা মনে করি, নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত সময় হলো নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাস। এ সময়ে আমরা নির্বাচন শুরু করার চেষ্টা করব। যতগুলো সম্ভব করব। কারণ ফেব্রুয়ারিতে রমজান আছে। মার্চের শেষদিকে কিছু নির্বাচন করা যেতে পারে। এরপর আমাদের দেশে ঝড়-তুফান হয়।
তিনি বলেন, সবকিছু মাথায় রেখে আগামী সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখে তফসিল ও নভেম্বরে ভোট শুরুর কথা ভাবছি। এটিকে ধরেই আমরা এগোচ্ছি। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের কোনো পরীক্ষা থাকে কি না সেটি বিচার-বিশ্লেষণ করব। নির্বাচনের জন্য আমাদের দেশে ভালো সময় হলো নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ। এই পাঁচ মাস খুব ভালো সময়। কিন্তু মাঝখানে রমজান পড়ে গেছে। এ সময়ে কোনো ভোট হবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইউনিয়ন পরিষদ দিয়ে শুরু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে সঙ্গে পৌরসভা নির্বাচনও করার কথা রয়েছে। তবে আগামী বছরে সব নির্বাচন শেষ হবে বলে মনে হয় না।’
ভোটের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নভেম্বরকে সামনে রেখে আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ জন্য পোলিং স্টেশন, প্রকিউরমেন্টসহ সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই আমরা এগোচ্ছি।
নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যাতে সংসদ নির্বাচনের মতো সুন্দর হয়, সে কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বসব।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, আমরা স্থানীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। নভেম্বরের শেষের দিকে বা ডিসেম্বরে ভোট হতে পারে। নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের বিষয়টি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যেমন বন্যা হলে আমি কী করব? এরপর দুর্গাপূজা আছে। এর মধ্যে নির্বাচন দিলে তো সমস্যা হয়ে যায়। এরপর পরীক্ষা আছে। এটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে অ্যাডজাস্ট করতে হবে।
তিনি বলেন, তবে এ বছরের মধ্যে শুরু করতে হবে। কাজেই আমরা হয়তো সেপ্টেম্বরে তফসিল দিতে পারি। সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল দিলে কিছু কিছু নির্বাচন এ বছর করতে পারব। বাকিগুলো আগামী বছর করতে হবে। আবার ফেব্রুয়ারিতে রোজা শুরু হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, গতবার ছয়টি ধাপে হয়েছে। প্রথম ধাপে ১ জুন তিন শতাধিক ইউপিতে ভোট হয়েছে। আমরা সেভাবেই হয়তো চিন্তাভাবনা করব। পার্বত্য ও বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে ড্রাই সিজনে করতে হবে। শীতকাল হচ্ছে ইলেকশনের মৌসুম।
২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং আরেক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সব কাউন্সিলরকে অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হয়। একই সময়ে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদও জনপ্রতিনিধিহীন হয়ে পড়ে।
ফলে প্রায় দুই বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়াই চলছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো। এবার এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সময়, আবহাওয়া, পরীক্ষা ও ধর্মীয় উৎসবের কারণে দ্রুত সব নির্বাচন শেষ করা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে