আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সহযোগিতা চাইবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ জন্য চলতি মাসে নিবন্ধিত দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবে নির্বাচান কমিশন। ইসির এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক দলগুলো। একটি ভালো নির্বাচন আয়োজনে ইসির প্রতি নৈতিক সমর্থনের আশ্বাসও দিয়েছেন তারা।
নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে অনেক মানুষ মারা যায়। অনেক সহিংসতা হয়। এবার যাতে কম মারা যায় বা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী এবং তাদের লোকজন যেন কোনো হাঙ্গামা না করে এ বিষয়ে সবাই যাতে সহনশীলতার পরিচয় দেয় সেজন্য সব রাজনৈতিক দলকে এক দিন ডাকব। সব দলের সঙ্গে একযোগে বসব। তাদের কাছে সহযোগিতা চাইব।’
কী রকম সহযোগিতা চাইবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সহযোগিতা বলতে যাতে সুন্দ নির্বাচন হয়। ঝামেলামুক্ত নির্বাচন হয়। কেউ যাতে ভায়লেন্স না করে ইত্যাদি।’
তিনি বলেন, ‘নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দল থেকে একজন বা দুজন করে প্রতিনিধি ডাকব। সবাই একত্রে আসবেন। একটা মিটিংয়ের মতো হবে, তারা যদি কোনো সাজেশন দেন শুনব আর আমরাও বলব। কোনো তারিখ নির্ধারণ না হলেও শিগগিরি বসব বলে আশা করছি। আমরা আগের (জাতীয়) নির্বাচন ভালো করেছি, এই নির্বাচনও যাতে ভালো হয় সে বিষয়ে তাদের সহযোগিতা চাইব।’
নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে ৬৩টি। এরমধ্যে তালিকার ৬ নম্বরে থাকা আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। এবার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। তাই নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি। এর আগে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই নির্বাচনে ২৯টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল।
এরপর ২০২১-২২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো দলীয়ভাবে নির্বাচন বর্জন করায় দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৪০টি দলের মধ্যে মোট ১১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। সেসব নির্বাচনে দলীয় অংশগ্রহণ কম হলেও সহিংসতা প্রাণহানি ছিল উল্লেখযোগ্য।
নির্বাচন কমিশন ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ও প্রাণহানি ঘটেছিল। ওই নির্বাচনে ২৩৬ জন নিহত এবং আট হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছিল। এরপর ২০২১-২২ সালের নির্বাচনে মোট ৬টি ধাপে ভোট হয়। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধু ২০২১ সালেই ইউপি নির্বাচনে সহিংসতায় ১১৩ জন নিহত হয়। পরবর্তী ধাপের সংঘাতসহ এ সংখ্যা ১১৬ জন ছাড়িয়ে যায়। ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনে সহিংসতার অন্যতম কারণ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় প্রতীক ব্যবহার। এ কারণে একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও মূল প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারের জেরে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে।
এবার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে তফসিল ও নভেম্বরে ইউপি নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা করেছে ইসি। তাই এই নির্বাচনে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাখা ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে কমিশন। এ কারণে এবার নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সাবেক কমিশন, কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম সময়ের আলোকে বলেন, বিগত নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রতীকের কারণে সহিংসতা ও প্রাণহানি বেশি ঘটেছিল। এবার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। তাই প্রাণহানি বা সহিংসতা কম হবে বলে মনে করছি। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো যদি চায় তা হলে সহিংসতা অনেক কমে আসবে। যেটা আমরা জাতীয় নির্বাচনে দেখেছি। কোনো দলই চাইবে না মাঠে একাধিক প্রার্থী থাকুক। তারা সেভাবেই মাঠ গোছাচ্ছে বলে জানতে পেরেছি। তাই প্রার্থী কম হলে সহিংসতাও কম হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচন করতে হলে নির্বাচন কমিশন সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা চায়। নির্বাচনে ছোট-বড় সব দল যদি নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা না করে তা হলে এটি হবে তাদের জন্য কঠিন একটি পরীক্ষা।
ইসির একার পক্ষে স্থানীয় নির্বাচনের মতো এত বড় নির্বাচন উঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ স্থানীয় নির্বাচনে ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।’ তিনি বলেন, একটি ভালো নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমাদের নৈতিক সমর্থন থাকবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মুসা সময়ের আলোকে বলেন, ‘ইসির এই উদ্যোগকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। আগে আমাদের সোশ্যাল পাওয়ারগুলোই স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিত। আওয়ামী লীগ এসে এটাকেও ভেঙে দিয়ে দলীয়করণ করেছিল। তখন সোশ্যাল হারমনিটা ভেঙে গিয়েছিল। এখন যাতে ওই হারমনিটা ফিরে আসে এবং যারা প্রার্থী হতে চান তারা যেন নির্বিঘ্নে প্রার্থী হতে পারেন এবং এই নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু হয় ইসি যেন সেই উদ্যোগ নেয়।’
তিনি বলেন, একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যত ধরনের সহযোগিতা আছে আমরা তা করব। কোনোভাবেই যেন এটি একটি সাজানো বা রক্তক্ষয়ী নির্বাচনের দিকে না যায় সেদিকে নজর রাখতে হবে।
উল্লেখ্য, এবারই প্রথম কোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় বা সংলাপের আয়োজন করতে যাচ্ছে ইসি। নির্বাচনে দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ধারাবাহিক সংলাপ বা মতবিনিময় প্রথা চালু হয়েছিল ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে।
এরপর ২০১২ সালে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ, ২০১৭ সালে কে এম নূরুল হুদা এবং ২০২২ সালে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন প্রতিটি নির্বাচন কমিশনই সংসদ নির্বাচন ও রোডম্যাপ ঘোষণার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের এ ধারা অব্যাহত রেখেছে। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছে এএমএম নাসির উদ্দিন কমিশন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে