জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে তার। তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বক্তব্য দিতে পারেন। তার প্রথম জাতিসংঘ ভাষণে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, শেখ হাসিনা সরকারের দমন-পীড়ন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দফতরের প্রতিবেদনে ওই সময়ের ব্যাপক প্রাণহানি ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য উঠে আসার পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে এসব বিষয় তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারেন তিনি।
এ ছাড়া তার প্রথম আন্তর্জাতিক এই বড় মঞ্চের বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার, রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু ঝুঁকির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসতে পারে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জাতিসংঘের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহতদের ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু। হাজার হাজার মানুষ আহত হন, যাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নির্বিচার গ্রেফতার, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও উঠে আসে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
পিতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মা প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ধারার তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে তারেক রহমান প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে দাঁড়াতে যাচ্ছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না— দেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের বার্তাও এতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে জানা গেছে।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের দমন-পীড়নের আন্তর্জাতিক তদন্ত, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ, রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু ঝুঁকি— সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে একসঙ্গে বহু প্রশ্ন।
সেই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের জাতিসংঘ ভাষণ শুধু সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বক্তব্য নয়; এটি হতে পারে নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ। সেখানে তিনি কতটা অতীতের জবাবদিহি, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বার্তা দিতে পারেন— সেদিকেই এখন নজর থাকবে দেশ-বিদেশের।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের জাতিসংঘ সফরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার, রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
এ সফর বাংলাদেশের জন্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। চার দশক পর এবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গত ৮ সেপ্টেম্বর তিনি ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।
হাসিনা প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের প্রতিবেদন ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক নথি হিসেবে রয়েছে। সেখানে সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধান ভলকার টুর্ক বলেছিলেন, আন্দোলন দমনে সাবেক সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল পরিকল্পিত ও সমন্বিত।
এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘে যদি গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার সুরক্ষা ও আইনের শাসনের কথা তুলে ধরেন, তা হলে সেটি বাংলাদেশের নতুন সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের আন্তর্জাতিক উপস্থাপন হিসেবেও বিবেচিত হবে। তবে বক্তব্যের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু এখনও পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি বলা হয়েছে, এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে দেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও উন্নয়ন সুযোগ তুলে ধরবেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হবে।
দুর্নীতি ও অর্থ পাচার : প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ বক্তব্যে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। ইতিমধ্যে সরকার বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে গেছে।
অর্থ উদ্ধারে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ ও পারস্পরিক আইনি সহায়তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়টি তুলতে পারেন। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো আরও কার্যকর করার আহ্বানও জানানো হতে পারে।
এটি হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থানের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থ পাচার প্রতিরোধ ও পাচার করা সম্পদ ফেরত আনার সহযোগিতার বিষয়টিও সামনে আসবে।
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক চাপ : প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে রোহিঙ্গা সংকটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময়ে রোহিঙ্গা নিয়ে একটি অধিবেশন থাকবে এবং সেখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইন অঞ্চলের পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের কারণে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন জটিল হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী এই সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানাবেন বলে পররাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
জলবায়ু নিরাপত্তা : বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতও জাতিসংঘে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবারের সাধারণ পরিষদের আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়ন, বৈশ্বিক সহযোগিতা ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। আর এই সময়েই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তার অগ্রাধিকারের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন, জলবায়ু পদক্ষেপ, পরিবেশ সুরক্ষা, মানবাধিকার, উদীয়মান প্রযুক্তির শাসনব্যবস্থা এবং জাতিসংঘ সংস্কারের বিষয় রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী ও সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতি এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়াবে।
চার দশক পর আবার বাংলাদেশের প্রতিনিধি সভাপতির আসনে : জাতিসংঘে এবারের বাংলাদেশ অধ্যায়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসন। গত ২ জুনের নির্বাচনে ড. খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকোরিসকে পরাজিত করেন। প্রতিদ্বন্দ্বী পান ৯১ ভোট। মোট ১৯০টি ভোট পড়েছিল। জাতিসংঘের আঞ্চলিক ঘূর্ণন পদ্ধতি অনুযায়ী ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল।
বাংলাদেশ এর আগে ১৯৮৬ সালে এই দায়িত্ব পেয়েছিল। তখন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, খলিলুর রহমান তখন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। চার দশক পর একই দেশের একজন কূটনীতিকের হাতে আবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব আসা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতিসংঘ ভূমিকা : শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেন। সেখানে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বৈষম্য, নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার নিয়ে বক্তব্য দেন। দ্বিতীয় তেল সংকটের প্রেক্ষাপটে ব্রান্ট কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতিসংঘে বাংলাদেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের কথা তুলে ধরেছিলেন। তার শাসনামলে (১৯৭৭-১৯৮১)
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি স্বনির্ভরতা, সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনি বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। পররাষ্ট্রনীতিতে নিরপেক্ষতার পথে হাঁটতে পছন্দ করতেন।
তিনি বিদেশি শক্তির প্রভাবে দেশ পরিচালনা না করে, বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তার এই নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ‘ব্লক-নিরপেক্ষতা’ তত্ত্বের অনুসরণ ছিল, যা ছিল পূর্ববর্তী শাসকদের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন।
প্রেসিডেন্ট জিয়া জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করেন এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেন। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য উন্নত দেশের সঙ্গে। পাশাপাশি, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনসহ পূর্ব ব্লকের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। তিনি আরব দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় সম্পর্কের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশ তখনও আরব বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো এবং জিয়াউর রহমানের কূটনীতির ফলে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে সৌদি আরব, কুয়েত এবং অন্যান্য গালফ দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। এসব দেশের সঙ্গে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, ঋণ সুবিধা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে সমন্বয় ঘটে। এই সম্পর্কগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিল মিশ্র। শাসনক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের অবস্থান এবং প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলেন। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি দেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতিরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, একটি দেশ যতই ছোট হোক না কেন, তার স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানানো অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এবং বিশ্ব শান্তির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
সার্ক বা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি ১৯৮০ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা, শান্তি ও উন্নয়নকে প্রচার করার লক্ষ্যে তিনি কাজ করেছিলেন। সার্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, যেমন— বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ এবং আফগানিস্তান, একে অপরের সঙ্গে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ক উন্নত করতে এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানে একযোগে কাজ করার সুযোগ পায়। এই ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার জন্য জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ জন্য তাকে সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
খালেদা জিয়ার জাতিসংঘ অভিজ্ঞতা : বিএনপির আরেক নেতা ও তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ারও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন এবং তার শাসনামলেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ ব্যাপক প্রসার লাভ করে।
জাতিসংঘে বিশ্বশান্তি, নিরস্ত্রীকরণ, দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে দেশের দৃষ্টিভঙ্গি জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশের তালিকায় শীর্ষস্থানীয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তিতে পরিণত হয়। সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করে পেশাদার ও আধুনিক করার পাশাপাশি তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর বৃহত্তর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও