ডিএসসিসিতে ময়লার বিল ১০০ টাকার বেশি আদায় চলছেই। সংগৃহীত ছবিঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের বিল মাসে ১০০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও এর বেশি আদায় বন্ধ হয়নি। বরং কোথাও কোথাও নির্ধারিত ১০০ টাকার সঙ্গে আরও ৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ডিএসসিসি এলাকার বাসিন্দারা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কোথাও রসিদে নির্ধারিত টাকা লেখা থাকলেও অনেক সময় এর চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়া হচ্ছে। এমনকি নিয়মিত ময়লাও সংগ্রহ করা হচ্ছে না। মাঝে মাঝে দুই-তিন দিন পরপর ময়লা নিতে আসছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। এতে বাসাবাড়িতে ময়লা জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। এ বিষয়ে অভিযোগ করলে ময়লা সংগ্রহই বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে কিছু বলেন না।
বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য মাসে ১০০ টাকা ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে ডিএসসিসি। ফলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের এই নির্ধারিত ফির বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ করছেন বাসিন্দারা। অবশ্য ১০০ টাকার বেশি নেওয়া হলে কিংবা এ বিষয়ে ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের গাফিলতি থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রশাসক।
চলতি বছরের মে মাসে ডিএসসিসির প্রশাসক বর্জ্য সংগ্রহকারী ঠিকাদারদের সতর্ক করে বলেছিলেন, বাসাবাড়ি থেকে নির্ধারিত ১০০ টাকার বেশি বর্জ্য সংগ্রহের বিল আদায় করা হলে এবং প্রতিদিনের ময়লা প্রতিদিন সংগ্রহ না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের খবর পাওয়া যায়নি।
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ‘১০০ টাকার বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। নির্ধারিত টাকার বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের গাফিলতি থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে চলতি বছরের ৪ জুন ডিএসসিসির সচিবের সই করা এক অফিস আদেশে ১০টি অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের (পিসিএসপি) কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, পিসিএসপিগুলো প্রতিদিন বর্জ্য সংগ্রহ করছে কি না, বাসাবাড়ি থেকে ১০০ টাকার বেশি ফি নেওয়া হচ্ছে কি না এবং সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) কার্যক্রম ঠিকভাবে হচ্ছে কি না—এসব বিষয় তদারকি করতে হবে। সার্বিক বিষয়ে ডিএসসিসির প্রশাসকের কাছে সাত দিন পরপর প্রতিবেদন দিতে হবে। কিন্তু তিন মাস পরও এই আদেশের প্রভাব মাঠপর্যায়ে দেখা যায়নি।
ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সাত দিন অন্তর প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও তা নিয়মিত জমা পড়ছে না। ফলে কোন ওয়ার্ডে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, কোথায় নিয়মিত ময়লা সংগ্রহ করা হচ্ছে না এবং কোন ওয়ার্ডে কোন প্রতিষ্ঠান শর্ত ভাঙছে—এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি হয়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, শুধু অফিস আদেশ দিয়ে এই অনিয়ম ও ময়লা-বাণিজ্য বন্ধ হবে না। ওয়ার্ডভিত্তিক ঠিকাদারদের তালিকা, নির্ধারিত ফি, অভিযোগ জানানোর নম্বর এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করতে হবে। তা না হলে ময়লা-বাণিজ্য চলতেই থাকবে।
রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকার জুলেখা বেগম বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত ময়লা নিলেও মাঝে মাঝে দুই-এক দিন পরপর আসেন। ময়লার টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় ১০০ টাকার বেশি নেন তারা। আরও ৫০ টাকা বেশি নেন। এই অতিরিক্ত টাকার কোনো রসিদ দেওয়া হয় না।’
তবে আরেক বাসিন্দা বলেন, তিনি প্রতি মাসে ১৬০ টাকা করে দেন।
মীর হাজীরবাগসহ যাত্রাবাড়ী এলাকা ডিএসসিসির অঞ্চল-৫-এর আওতাধীন। এ অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন কোনো অভিযোগ আসেনি। ওয়ার্ড পর্যায়ে দল গঠন করা হয়েছে। সবকিছু সার্বিক তদারকির মধ্যে আছে। অনেক অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ও নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘রসিদের বাইরে টাকা নেওয়া সেবা নয়, চাঁদাবাজি। ১০০ টাকার বেশি নেওয়ার পরও কর্মকর্তারা যদি প্রতিবেদন না দেন, তাহলে তারা অনিয়ম ঠেকাচ্ছেন না। বরং অনিয়মের সুযোগ দিচ্ছেন। এই ব্যর্থতার দায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও নিতে হবে।’
সময়ের আলো/জেডআই