একসময় বাংলাদেশের খাবারের পাতে ভাতই ছিল সবচেয়ে বড় অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলাচ্ছে। গত দুই দশকে মাথাপিছু ভাত খাওয়ার পরিমাণ ২৫.২ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে ফল, সবজি, মাছ, মাংস ও ডিমের মতো খাবারের গ্রহণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপের ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের চার পর্বের জাতীয় গড় খাদ্য গ্রহণের তথ্য বিশ্লেষণে এ পরিবর্তন উঠে এসেছে। একই সময়ে পরিবারের মোট ব্যয়ের মধ্যেও খাদ্যের অংশ কমেছে। বেড়েছে আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন ও যোগাযোগের মতো খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আয়ের প্রবৃদ্ধি, নগরায়ণ, পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলেই মূলত খাদ্যাভ্যাসে এই ধারা তৈরি হয়েছে।’
ভাতের আধিপত্য কমছে
২০০৫ সালে একজন বাংলাদেশি গড়ে প্রতিদিন ৪৩৯.৬ গ্রাম ভাত খেতেন। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩২৮.৯২ গ্রামে। অর্থাৎ দুই দশকে ভাত গ্রহণ কমেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
অন্যদিকে ফল খাওয়ার পরিমাণ ৩২.৫ গ্রাম থেকে বেড়ে ৯৫.৪ গ্রামে পৌঁছেছে। প্রায় তিনগুণ এই বৃদ্ধিতে ফল জাতীয় খাদ্য তালিকায় আলু ও মাছকে পেছনে ফেলে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে।
সবজি খাওয়াও বেড়েছে। ২০০৫ সালে মাথাপিছু দৈনিক সবজি গ্রহণ ছিল ১৫৭ গ্রাম, যা ২০২২ সালে বেড়ে হয়েছে ২০১.৯২ গ্রাম। ফলে ভাত ও সবজি খাওয়ার ব্যবধানও কমেছে। একসময় সবজির তুলনায় ২.৮ গুণ বেশি ভাত খাওয়া হলেও এখন সেই অনুপাত ১.৬ গুণ।
মাছ-মাংস-ডিমে বাড়ছে ঝোঁক
মাছ খাওয়ার পরিমাণ ৪২.১ গ্রাম থেকে বেড়ে ৬৭.৮৩ গ্রামে পৌঁছেছে। তবে ফল ও মাংসের মতো কিছু খাবারের গ্রহণ আরও দ্রুত বাড়ায় জাতীয় খাদ্য তালিকায় মাছ চতুর্থ থেকে পঞ্চম অবস্থানে নেমেছে।
প্রাণিজ আমিষে পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। গরুর মাংসের দৈনিক গ্রহণ ৭.৮ গ্রাম থেকে বেড়ে ১১.৬৬ গ্রাম হয়েছে। মুরগি ও হাঁসের মাংস ৬.৮ গ্রাম থেকে বেড়ে ২৬.১৭ গ্রামে দাঁড়িয়েছে। ডিমের গ্রহণও ৫.২ গ্রাম থেকে বেড়ে হয়েছে ১২.৭৩ গ্রাম।
ডাল খাওয়ার পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও খাদ্য তালিকায় এর অবস্থান নবম থেকে একাদশে নেমেছে। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের গ্রহণও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
বৈচিত্র্য এলেও ঝুঁকি আছে
খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য বাড়লেও সব পরিবর্তন স্বাস্থ্যকর নয়। ভোজ্য তেলের দৈনিক গ্রহণ ১৬.৫ গ্রাম থেকে বেড়ে ৩০.৮৫ গ্রামে উঠেছে। এর সঙ্গে চিনি ও প্রাণিজ চর্বির অতিরিক্ত গ্রহণ যুক্ত হওয়ায় খাদ্য বৈচিত্র্য সবসময় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
খাবারের বাইরে বাড়ছে পরিবারের খরচ
২০০৫ সালে একটি পরিবারের মোট ব্যয়ের ৫৩.৮ শতাংশ খাবারের পেছনে যেত। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫.৮ শতাংশে। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় ৪৬.২ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৪.২ শতাংশ।
তবে এই পরিবর্তনের সুফল সবার জন্য সমান নয়। সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের মোট ব্যয়ের ৫৯.৮ শতাংশ এখনও খাবারে চলে যায়। ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৮.৯ শতাংশ।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দরিদ্র পরিবারগুলোতে পারিবারিক বাজেটের বড় অংশ এখনও রান্নাঘরের পেছনেই যায়। খাদ্য বৈচিত্র্য এখনো অসম। স্বল্প-আয়ের পরিবারগুলো এখনো ভাতের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। পণ্যের দাম বাড়লে তারা প্রথমেই পুষ্টিকর খাবারের বাজেট কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়।’
সময়ের আলো/এমকে