কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতির লাগাম টানার আহ্বান জানিয়েছেন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ‘উই মাস্ট পেস দ্য ফ্রন্টিয়ার’ শিরোনামের এক লেখায় তিনি এআই শিল্পের জন্য ৩ ধাপের একটি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। এর প্রথম ধাপটি অ্যানথ্রপিক নিজ উদ্যোগেই বাস্তবায়ন করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আমোদেইর পরিকল্পনার প্রথম ধাপে তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন মূল্যায়নকারীদের অ্যানথ্রপিকের এআই ব্যবস্থায় কর্মীদের মতো স্থায়ী প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তানীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, বিভিন্ন ঘটনা এবং প্রশিক্ষণের সময় এআই মডেলের নিরাপত্তা ও সামঞ্জস্য কতটা নিশ্চিত হচ্ছে- এসব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারবেন।
অ্যানথ্রপিকের এই ঘোষণার কয়েক দিন আগে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন এআই নিয়ে গুরুতর সতর্কবার্তা দেন। ধারাবাহিক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ২০৩০ সালের মধ্যেই এআই মানবসভ্যতার বিলুপ্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
কক্সনের ভাষ্য, এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় অ্যানথ্রপিক ও তার সাবেক কর্মস্থল ওপেনএআই যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এমন উদ্বেগ থেকেই তিনি চাকরি ছেড়েছেন বলে জানান। তার অভিযোগ, দুই প্রতিষ্ঠানই স্ব-উন্নয়নশীল অতিবুদ্ধিমান এআই তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছে।
তবে অ্যানথ্রপিকের এক মুখপাত্র দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া বিবৃতিতে বলেন, এআই একদিকে যেমন বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করবে, অন্যদিকে তেমনি নজিরবিহীন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে- এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই স্বচ্ছ। এআই মডেলের জন্য শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে তারা কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
আমোদেইর প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি বলেন, এআইয়ের অগ্রগতির গতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আমোদেইর সঙ্গে তিনি একমত। স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নকারীদের কর্মীদের মতো প্রবেশাধিকার দেওয়ার ধারণাকেও তিনি ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। ওপেনএআইও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে বলে জানান অল্টম্যান।
ইলন মাস্কও আমোদেইর বক্তব্যকে সমর্থন করে সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বলেন, ‘দারিও ঠিক বলেছেন।’ ওপেনএআইয়ের গবেষক এইডেন ম্যাকলাফলিনও আমোদেইর লেখার প্রশংসা করে জানান, এর প্রায় প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গেই তিনি একমত।
আমোদেইর মতে, সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা হলে এআই মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তিটির শক্তি যত বাড়ছে, এর ঝুঁকিও তত গুরুতর হয়ে উঠছে।
তিনি মনে করেন, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার কারণে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করাই যথেষ্ট নয়। এআইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর গতিও এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন, যাতে নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলো একই সঙ্গে নিজেদের উন্নত করার সুযোগ পায়।
গত কয়েক মাসে এআইয়ের সক্ষমতা যেভাবে দ্রুত বেড়েছে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আমোদেই। বিশেষ করে এআইয়ের নিজের সক্ষমতা নিজেই উন্নত করার প্রক্রিয়া বা পুনরাবৃত্তিমূলক স্বউন্নয়ন নিয়ে তিনি সতর্ক করেন।
তার আশঙ্কা, এআইয়ের এই অগ্রগতি যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে থাকে, তাহলে একপর্যায়ে মানুষের এআই ব্যবস্থা বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই আরও শক্তিশালী এআই তৈরির পথে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোনোর ওপর জোর দেন তিনি।
সম্প্রতি এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে ওপেনএআইয়ের তৈরি কয়েকটি এআই এজেন্টের অনুপ্রবেশের ঘটনাও উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন আমোদেই। তার মতে, ওই এআই এজেন্টগুলোর উদ্দেশ্য ক্ষতিকর ছিল না- এই কারণে ঘটনাটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে আরও সক্ষম এআই ব্যবস্থার মধ্যে একই ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ দেখা দিলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী ক্লেমঁ দেলাংয়ুও আমোদেইর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন। তিনি বলেন,‘এআইকে মানুষের উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তার মতে, মাত্র কয়েকটি বড় এআই প্রতিষ্ঠানের বন্ধ দরজার মধ্যে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অ্যানথ্রপিকের তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়ন কর্মসূচিতেও অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে হাগিং ফেস।
আমোদেইর প্রস্তাবিত ৩ ধাপের প্রথমটিতে এআইয়ের উন্নয়ন এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ গতিতে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে, যাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট সময় পায় এবং স্বাধীন মূল্যায়নকারীরা সেগুলো যাচাই করতে পারেন। দ্বিতীয় ধাপে পুরো এআই শিল্পের মধ্যে সমন্বয় এবং তৃতীয় ধাপে বৈশ্বিক পর্যায়ে সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তবে সব ধাপ একই ক্রমে বাস্তবায়ন করতে হবে- এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলেও উল্লেখ করেছেন।
আমোদেই বলেন, এআই মানবজীবনের মান ব্যাপকভাবে উন্নত করতে পারে- এই বিশ্বাস তার এখনো অটুট। তবে, নিরাপদ পর্যায়ে এআইয়ের উন্নয়নের গতি ধরে রাখা সহজ হবে না। তারপরও মানবতার স্বার্থে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন অ্যানথ্রপিকের সিইও।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান
সময়ের আলো/মহু