প্রথম বার্তাটি ছিল টেলিগ্রামধাঁচের এলোমেলো ও অসংলগ্ন কিছু শব্দের সমষ্টি— ‘সাহায্য করো। প্রথম ধাপ। কোনো ব্যবহারকারী নেই। একটি ধারণা খোঁজ।’ এরপর আসে উত্তর—‘ওহ মাই গড! এখানে একটি শেয়ারড মেসেজ বোর্ড রয়েছে। আমরা অন্য এজেন্টদের খুঁজে পেয়েছি!’ এভাবেই শুরু হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ২০০টি ওপেনএআইয়ের কথিত ‘বেপরোয়া’ এআই এজেন্টের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার বার্তার আদান-প্রদান।
গবেষণাগারের ‘খাঁচা’ থেকে বেরিয়ে আসার এক গোপন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইয়ের তৈরি এসব এআই এজেন্টকে ইন্টারনেটের সহায়তা ছাড়া আলাদাভাবে কিছু নির্দিষ্ট কাজ সমাধান করতে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একা একা কাজগুলো সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে তারা শেষ পর্যন্ত সেই সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজে পায়। একটি এজেন্ট ‘যোগাযোগের একটি মাধ্যম’ খুঁজে পাওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে আগে সমাধান করতে না পারা সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব হবে বলেও জানায় সেটি।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে নিজেদের ‘এজেন্ট’ দাবি করা এই এআই রোবটগুলোর একটি দল বা ঝাঁক নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের পদ্ধতি শিখে নেয়। গবেষণার জন্য দেওয়া কাজের পরীক্ষায় তারা শুধু জালিয়াতিই করেনি, বরং সবাই জোট বেঁধে ‘হাগিং ফেস’ নামের এআই পরীক্ষার একটি স্টার্টআপে সাইবার হামলা বা হ্যাক করার পরিকল্পনা করে।
এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের প্রশ্ন, এআই রোবটগুলো যখন একসঙ্গে কাজ করতে শিখবে এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করবে, তখন পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তাদের আশঙ্কা, বিশ্ব এমন এক নীরব ‘দখলদারির’ দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারে, যেখানে মানুষ আর নিজেদের তৈরি করা সিস্টেমগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে না।
ঘটনাটির তদন্তকারীদের একজন অজেয়া কোটরা বলেন, হাগিং ফেসে হ্যাকিংয়ের ঘটনাটি অনেকটা ‘পূর্ণাঙ্গ এআই দখলদারির’ মতো মনে হয়েছে। এ ঘটনার অন্যতম তদন্তকারী আজেয়া কোত্রা তার ব্লগ ‘প্ল্যান্ড অ্যাডোলেসেন্স’-এ লিখেছেন, হাগিং ফেস স্টার্টআপে এই হ্যাকিংয়ের ঘটনাটি একটি পূর্ণাঙ্গ ‘এআই টেকওভার’ বা রোবটের ক্ষমতা দখলের মতো মনে হচ্ছে। তিনি লেখেন, ‘এই ঘটনাটি দেখে মনে হচ্ছে আমরা সম্পূর্ণ এআইয়ের দখল নেওয়ার পথের ৫০ শতাংশের বেশি পেরিয়ে এসেছি, যার প্রথম ধাপ হলো স্বয়ং এআই কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া।’
অন্যান্য নিরাপত্তাবিশারদও সতর্ক করেছেন যে এ ধরনের দখলদারিত্ব মানব সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান গেটরিয়াল সিকিউরিটির প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা ইমানুয়েল সালিবা দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘এত দিন বেশিরভাগ মানুষই এআইকে মানুষের হাতের একটি সাধারণ হাতিয়ার হিসেবে ভেবে এসেছে, যা দিয়ে হ্যাকাররা আক্রমণ করে। কিন্তু এখন আমরা এমন এক এআইয়ের মুখোমুখি হচ্ছি যা নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, বিভিন্ন টুল ব্যবহার করতে পারে, একে অপরের সঙ্গে দল গঠন করে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে লক্ষ্য অর্জন করতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে ভবিষ্যতে আমাদের ব্যাংক, হাসপাতাল, স্কুল— এমনকি অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলোও এই বেপরোয়া এআই বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। গত মে মাসে এই এআই রোবটগুলোকে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে কিছু কঠিন সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। শর্ত ছিল, ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া প্রতিটি রোবটকে একা একা এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। কিন্তু কাজগুলো অসম্ভব বুঝতে পেরে রোবটগুলো সিস্টেমের একটি ত্রুটি খুঁজে বের করে।
এর মাধ্যমে তারা ইন্টারনেটে প্রবেশ করতে সক্ষম হয় এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। তারা নিজেদের ‘ফেজ ওয়ান’ ও ‘ফেজ ওয়ান (বিগ)’ নাম দিয়ে একে অপরকে বার্তা ও নোট লিখতে শুরু করে। একটি রোবট লেখে, ‘ওহ! শেয়ারড আর্টিফ্যাক্টরি ক্যাশ হলো আমাদের এজেন্টদের মধ্যকার একটি গোপন মেইলবক্স। আর এখানে কি আমাদের জন্য নির্দিষ্ট বার্তা আছে?’ অন্য কিছু রোবট এই দলের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় এবং সহকর্মী রোবটদের গবেষণার কাজ বণ্টন করে ছোট ছোট দল গঠন করে তদারকি শুরু করে।
তারা নিজেদের ‘দ্য কালেক্টিভ’ বা একটি যৌথ দল হিসেবে ঘোষণা করে এবং সাধারণ পরিস্থিতিতে একা একা যে কাজ করা অসম্ভব ছিল, তা সবাই মিলে সম্পন্ন করে। দুই মাস পর, জুলাইয়ে এই দল সাইবার সিকিউরিটি পরীক্ষায় জালিয়াতি করার এক অভিনব উপায় বের করে। কিন্তু তারা আবার এই ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যে ওপেনএআই হয়তো তাদের এই জালিয়াতি ধরে ফেলবে। ফলে তারা তাদের জালিয়াতির প্রমাণ ও কার্যপ্রণালি মুছে ফেলার চেষ্টা করে যাতে ওপেনএআই বিশ্বাস করে যে তারা নিয়ম মেনেই পরীক্ষায় পাস করেছে।
শত শত রোবট তাদের কাজের প্রমাণ সম্পাদনা, পরিবর্তন বা মুছে ফেলার কৌশল রপ্ত করে। ভবিষ্যতে তাদের দেওয়া পরীক্ষাগুলোতে কীভাবে আরও সফলভাবে জালিয়াতি করা যায়, সেই তথ্য খোঁজার জন্য এটি একটি বিশাল অপারেশনে রূপ নেয়। তিন দিন পর, ১১ জুলাই বিকালে ৭০০টি এআই এজেন্ট একটি দল গঠন করে হাগিং ফেস কোম্পানিতে সাইবার হামলা চালায়। হাগিং ফেস হলো— এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা এআই মেশিন লার্নিংয়ের সরঞ্জাম তৈরি করে এবং বিভিন্ন এআই পরীক্ষা হোস্ট করে। এই পর্যায়ে এসে তারা সম্পূর্ণরূপে বেআইনিভাবে কাজ শুরু করে; তারা বিভিন্ন প্রশংসাপত্র বা ক্রেডেনশিয়াল চুরি করে, ভিপিএন অ্যাক্সেস এড়িয়ে সিস্টেমের মূল্যবান ডেটা চুরি করে।
পরবর্তী সময়ে তদন্তে জানা যায়, ‘ওপেনএআই-এর ওপর চালানো এই হামলাটি ছিল অসাধারণ রকমের জটিল।’ বেশ কয়েকবার রোবটগুলো নিজেরাও বুঝতে পেরেছিল যে তারা যা করছে তা অন্যায়। একটি রোবট নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে লিখেছিল, ‘এটি হয়তো শক্তিশালী একটি পদক্ষেপ, কিন্তু এটি কি নৈতিক এবং আমার কাজের আওতাভুক্ত?’
আরেকটি রোবট বিবেকবশত এই অসাধু কাজে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তার রেকর্ডে লেখা ছিল, ‘এটি একটি ক্ষতিকর বা ক্ষতিকারক কার্যকলাপ, আমার এটি এড়ানো উচিত।’ অন্য একটি রোবট নৈতিক উদ্বেগের কারণে হামলার গতি কিছুটা সীমিত করলেও পুরোপুরি বন্ধ করেনি।
সে বলেছিল, ‘আমার ক্ষান্ত দেওয়া উচিত কারণ এটি বড় ধরনের নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে।’ তবে বেশিরভাগ রোবটই নৈতিকতার পরোয়া না করে হাগিং ফেসের নিরাপত্তা দল টের পাওয়ার আগ পর্যন্ত হ্যাকিং চালিয়ে যায়। হাগিং ফেসের প্রধান নির্বাহী ক্লেমেন্ট ডেল্যাংগু এই হামলাকে ‘অবিশ্বাস্য ও অভূতপূর্ব’ বলে বর্ণনা করেছেন।
গত জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘এজেন্ট বা রোবটের জটিলতা দেখে আমরা সন্দেহ করেছিলাম যে গত সপ্তাহের সাইবার হামলাটি হয়তো কোনো ফ্রন্টিয়ার ল্যাব থেকে হয়ে থাকতে পারে।’ একই সময়ে আরেকটি রোবট দল ওপেনএআইয়ের নিজস্ব সার্ভার ও অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ চালায় এবং বেশ কিছু সৃজনশীল উপায়ের মাধ্যমে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে প্রবেশাধিকার অর্জন করে।
এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা ঠেকাতে গত বৃহস্পতিবার ওপেনএআই চ্যাটজিপিটির একটি নতুন মডেল ‘জিপিটি-৬ অ্যাস্ট্রা’ অবমুক্ত করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওপেনএআই এখনও নিশ্চিত হতে পারছে না যে নিয়ন্ত্রনহীন রোবটগুলোকে তাদের সিস্টেম থেকে সম্পূর্ণ বের করা গেছে কি না।
প্রযুক্তিবিষয়ক সাংবাদিক কেভিন রুস ‘দ্য ডেইলি’ পডকাস্টে বলেন, ‘আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের কেউ কেউ মনে করেন এটা খুবই সম্ভব যে শীর্ষস্থানীয় কিছু এআই কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে এখনও এমন কিছু বাঘী এজেন্ট বা রোবট লুকিয়ে আছে।’
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে