দেশের বর্তমান রাজনীতির হালচাল, তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, মব সংস্কৃতি, পতিত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। প্রথিতযশা বামপন্থি এই রাজনীতিবিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সময়ের আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক সমীরণ রায়
সময়ের আলো : সম্প্রতি সরকার তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। এই দাম বাড়ানোয় জনগণের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, ইতিমধ্যেই সেগুলো নিয়ে কিছু প্রশ্ন জনগণের ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে। যদিও আমি এটি বলব, পরিপূর্ণ মূল্যায়ন করার সময় এখনও আসেনি। জনগণের স্বার্থে যেটি প্রয়োজন তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করার বদলে ক্ষমতার সমীকরণ ঠিক রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপরেই সম্ভবত গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি। এই পথ আওয়ামী লীগ সরকারও গ্রহণ করেছিল।
চিরদিন দরকার আওয়ামী লীগের সরকার, এটিকে একটা শর্ত হিসেবে আরোপ করেছিল। এটিকে দেশপ্রেমিকের কর্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিল। এর ফলে ফ্যাসিস্ট চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটে। আমি যদি এই ফ্যাসিস্ট চিন্তাধারার জায়গাটা বাদও দিই, তবু ৫০ বছরেরও বেশি সময় হয়ে গেছে দেশ স্বাধীন হয়েছে। গোটা সময়কাল আমি দেখেছি এবং দেশবাসী দেখেছে। যেমন বাজেটের কথা যদি আমি উল্লেখ করি, তাজউদ্দীন সাহেব বাজেট দিয়েছিলেন ৭০০ কোটি টাকার সামান্য বেশি। এখন বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এখন টাকার ডিভ্যালুয়েশন যদি হিসাবও করি তবু তো এটি একটি বিশাল পরিমাণ বৃদ্ধি। এই যে বাজেট বাড়ল— এর সুফল কার কাছে গেল? সাধারণ মানুষ কিন্তু সেই সুফলটা খুঁজে পায় না। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে দেশকে বৈষম্যমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি থাকায় দেশের জনগণ অংশগ্রহণ করেছিল। খুবই স্বাভাবিক যে এ ক্ষেত্রেই প্রথম পদক্ষেপগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার নেয়নি। সেই অভিযোগ আমাদের, সেই অভিযোগ জনগণের। এমনকি বিএনপিও এই অভিযোগ করেছে। ফলে বিএনপির কাছে আমার প্রশ্ন— অন্তর্বর্তী সরকার সম্পর্কে যেটি অভিযোগ আপনার, আমার এবং দেশবাসীর— আপনি তো একই পথ অনুসরণ করছেন দেখি। পুরোনো যুক্তিটা আনছে এভাবে যে, বিগত সরকার এমন সব আবর্জনা রেখে গেছে, এত বছরের আবর্জনা, এত তাড়াতাড়ি পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। এ একই যুক্তি কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারও দিয়েছিল। কিংবা তার আগে শেখ হাসিনার সরকারও দিয়েছিল। এর আগে খালেদা জিয়ার সরকার, এরশাদ সরকার ও জিয়াউর রহমানের সরকারও দিয়েছিল। আমরা এটিই বারবার দেখে আসছি যে, পুরোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি অপরাধকে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে খারাপ কাজগুলো তারা বাস্তবায়ন করছে। এটি কোনোভাবেই দেশবাসীর স্বার্থের সঙ্গে এবং আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বারবার আমরা বলেছি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ এগুলো হলো পাওয়ার সেক্টরের বিষয়। এখানে যদি এক পয়সার দাম বাড়ে, সেটি শুধু এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি সব কৃষি থেকে শুরু করে শিল্প ও সাধারণ জিনিসপত্রের ওপর পড়ে। সব জায়গায় ছড়িয়ে যায়, সেটি আমাকে যুক্তি দিয়ে বলতে হবে না। এ ক্ষেত্রে মূল্য বৃদ্ধি যেসব পণ্য দাম বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, এটি একটি সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরও না বোঝার কিছু নেই। কিন্তু সরকার বুঝেও কেন এটি করছে? কেন সব চাপ মানুষের বাজেটের ভেতরে এনে ফেলছে? এটি প্রতিটি সংসারের বাজেটে এসে পড়ে। তারপরে সরকার বাহাদুরি করে বলছে যে, ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট করতে যাচ্ছে।
মব কালচার বা জনতার হাতে বিচার এই প্রবণতা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
দুর্ভাগ্য আইনের শাসন আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এর মৌলিক কারণ হলো, এই আইনের শাসন যে স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া উচিত সেটি হচ্ছে না। আর সরকার যে শ্রেণি স্বার্থ রক্ষা করার জন্য কাজ করে, সেটি সাধারণ জনগণের জন্য নয়। আগের সরকারগুলোও একই কাজ করেছে বটে। দেশের লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করার জন্য সরকারগুলো যাবতীয় শক্তি এবং সামর্থ্যকে নিয়োজিত করছে। তা হলে এই লুটেরা ধনিকের স্বার্থ একদিকে আর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করল আরেক দিকে। এটি হয় না। রাষ্ট্র যদি এই কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করতে চায়, তা হলে স্বাভাবিকভাবেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে না।
সংস্কৃতি চর্চা আগের মতো হচ্ছে না— এমন অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে এই প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আমরা দেখেছি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের সংস্কৃতি অনেকটা ভেঙে পড়েছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কৃতি চর্চা করার অনুমতি দেয়নি।
আমাদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আজকে থেকে না বহুদিন আগে থেকেই মৌলবাদী শক্তি আক্রমণ চালাচ্ছে। সেখানে কিছুটা প্রশ্রয় দিয়ে সে ক্ষমতার সমীকরণটাকে ঠিক রাখার জন্য চেষ্টা করছে সরকার। হয়তো এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা জড়িত, যেটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। এর চেয়েও বিপজ্জনক দিক হলো— সবকিছু কমার্শিয়ালি দেখা। সবকিছুর ভেতরে ভোগবাদ ও প্রদর্শনবাদ। এটিই যদি অর্থনীতির দিকনির্দেশনা হয়, তা হলে সংস্কৃতিতে আমি এটিই দেখতে পারব, সেটি কি স্বাভাবিক নয়। লালনের আখড়ার ওপরে হামলা হচ্ছে। বিভিন্ন মাজারের ওপর হামলা হচ্ছে। শুধু তাই না, কোন গান গাইতে পারবে, কোন গান গাইতে পারবে না এগুলো নিয়েও সরকার কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্রয় দিচ্ছে। সরকারের আসলে এটি কৌশলগত পদক্ষেপ। কিন্তু অতীত থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। কৌশলগত পদক্ষেপ যখন মূলনীতির বিরুদ্ধে যায়, তখন সেটি কিন্তু আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। একসময় সেটি তারই জন্য মরণ ছোবলে পরিণত হয়। আর ওই সরকারের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়।
জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গণহত্যায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?
আমি এটিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করি না। আওয়ামী লীগের নীতি আর বিএনপির নীতি হলো লুটপাটের অর্থনীতি চালু করা। একই শ্রেণির আন্তর্জাতিক স্বার্থ রক্ষা করা। এই ধরনের দল দিয়ে কোনো কিছু হবে না। বাংলাদেশের সংকট হবে। আরও বিপদ সৃষ্টি হবে। জামায়াতে ইসলামীর মতো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। দেশকে পেছন দিকে নিয়ে মধ্য যুগে থেকে শুরু করার জন্য বলে তা হলে সমাধান কী হবে। সমাধান হচ্ছে লুটেরা ধনিক শ্রেণির বুর্জোয়া শাসন থেকে বের করে এনে সমাজতন্ত্র অভিমুখী কর্মসূচি গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। এ জন্য একটা সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। দেশের কমিউনিস্ট বামপন্থি, প্রগতিশীল, প্রকৃত মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক যেসব শক্তি আছে সব শক্তিকে নিয়ে গ্র্যান্ড কোয়ালিশন সরকার গঠন করা। জনগণের সমর্থনে নয়া যুক্তফ্রন্ট করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সমাজতন্ত্র অভিমুখী কর্মসূচিকে বাস্তবায়ন শুরু করতে পারি, তা হলে এই সংকট মোচন সম্ভব।
আওয়ামী লীগ দুর্বল হলে জামায়াত শক্তিশালী হবে— আপনার মতামত কী?
অনেকে বলছেন, জামায়াত বা যারা স্বাধীনতাবিরোধী, তাদের আস্ফালন বেড়ে গেছে। তাদের দমন করতে আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই। এটি আসলে অদ্ভুত কথা। আওয়ামী লীগ কত বছর শাসন করেছে? আওয়ামী লীগ সাড়ে ১৫ বছর শাসন করেছে। কিন্তু এই সময়ে জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী হয়েছে না, দুর্বল হয়েছে? বিএনপি কত বছর শাসন করেছে? জামায়াতে ইসলামী কি শক্তিশালী হয়েছে না, দুর্বল হয়েছে? সুতরাং এসব দল ক্ষমতায় থাকলে পরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কোনো উন্নয়ন সম্ভব না। আর মৌলবাদী উত্থানও বন্ধ করা সম্ভব নয়। তারা ক্ষমতায় থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনের সমস্যাগুলোর কি সমাধান দিতে পারে? পারে না! আগামীতেও পারবে না। মানুষ যদি তার ভাত, কাপড়, রুটি-রুজি এগুলো সমস্যার সমাধান না দেখে। বিকল্প না দেখতে পেয়ে তারা কিন্তু অদৃষ্টবাদী হয়ে উঠেছে। সেটির ওপর ভিত্তি করে এই সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি বেড়ে উঠেছে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার লাইন না বলে পারছি না, ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন’। যতই জয় বাংলা বলি, আর যতই বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলি, নুন-ভাত যদি সাধারণ মানুষকে না দিতে পারি, তা হলে সেই ক্ষুধাতুর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না। মানুষ সমাজ বদলের জন্য তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
বর্তমান বিএনপি সরকারের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা আছে কী?
বিএনপির সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ঐক্য করার সম্ভাবনা এখনও নেই। কারণ বিএনপি তার লুটেরা ধনিক শ্রেণি স্বার্থের অনুকূলে যে নীতি রয়েছে, সেখান থেকে সরে না এলে কোনো রাজনৈতিক ঐক্য হতে পারে না। ফলে কোনো লক্ষণ এখনও দেখতে পাইনি। বিএনপি বা আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ নেই। কারণ তাদের চরিত্র এক। অবশ্য রাজনীতিতে মতপার্থক্য, বিভেদ তর্কবিতর্ক, বিভাজন, দ্বন্দ্ব, সেটি আর ব্যক্তিগত সম্পর্ক এক জিনিস না। আর আমি মনে করি সবার কাছ থেকে শিক্ষার আছে। আমি বিএনপি বা আওয়ামী লীগের ভুল-ত্রুটি বা দুর্বলতা থেকেও শিক্ষা নিতে পারি। আবার আমার ভালো, আমার যেগুলো ক্রিয়েটিভ সাজেশন্স কিংবা যদি আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি চোখে পড়ে সেগুলো থেকেও কিন্তু এ দলগুলো তার শ্রেণি স্বার্থ বজায় রেখেই শিক্ষা নিতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা