প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুলশানের বাসভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে নিজের বাসভবনেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারি সূত্র।
দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে জ্বালানি আমদানির চাপ। গ্যাস সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিচ্ছে সরকার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ। সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের ছাদেও বসছে সৌর প্যানেল।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের কাজ দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ‘আমি আজকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে দিয়ে আসার সময় দেখে এসেছি, বাসার ছাদের ওপর সোলার প্যানেলের কাজ চলমান রয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগের প্রতীকী গুরুত্বও রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যখন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে, তখন প্রধানমন্ত্রীর নিজ বাসভবনে একই ব্যবস্থা স্থাপন সেই বার্তাকে আরও দৃশ্যমান করতে পারে।
বাড়ছে প্রণোদনা
সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে এরই মধ্যে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ১ সেপ্টেম্বর জারি করা নির্দেশনায় ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক নিজের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এই বিশেষ সুবিধা পেতে হলে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিশেষ মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এই দামে বিদ্যুৎ কেনা হবে ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের মূল্য তিন মাস পরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে পরিশোধ করা হবে। তবে সৌর প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার, মিটারসহ ব্যবস্থার সব যন্ত্রপাতি সরকার নির্ধারিত মানের হতে হবে।
সরকারি ভবনে বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ
শুধু ব্যক্তিগত বাসাবাড়ি নয়, সরকারি ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনের ছাদকেও সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বিপুলসংখ্যক সরকারি ভবনের ছাদ বছরের বেশির ভাগ সময় খোলা থাকে। এসব জায়গা ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে দিনের বেলায় অফিস চলাকালে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এছাড়া, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ থাকায় ভবিষ্যতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ একটি বিকল্প বিদ্যুৎ উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতে নতুন চাপ
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিবছর বাড়ছে। চাহিদা পূরণে গ্যাস, কয়লা, তরল জ্বালানি ও আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর মধ্যে জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে চাপ তৈরি করছে।
এ অবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর যুক্তি হচ্ছে—সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে একবার ব্যবস্থা স্থাপন করার পর দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। বিশেষ করে দিনের বেলায় শিল্পকারখানা, অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের বড় চাহিদা থাকে। ওই সময়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে সৌরবিদ্যুতের প্রসারেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্থাপনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাটারির ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্দিষ্ট সময় পর পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন সূর্যালোকনির্ভর হওয়ায় রাতের বেলায় উৎপাদন বন্ধ থাকে। ফলে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় এবং কার্যকর সংরক্ষণব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রীর বাসা থেকে বার্তা
সরকারের বর্তমান উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু কয়েকটি ভবনের ছাদে প্যানেল বসানো নয়, বরং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্যেই একদিকে আর্থিক প্রণোদনা, অন্যদিকে সরকারি ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নিজের বাসভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সেটি সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের নীতির একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হবে। এখন এই উদ্যোগ কতটা দ্রুত সরকারি ভবন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের বাসাবাড়িতে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, সেটিই দেখার বিষয়।
সময়ের আলো/জেকিউএফ