কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে থাকা ১২ বছর বয়সী পথশিশু রায়হানকে (ছদ্মনাম) জোর করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করতে পা কেটে দেওয়া এবং কিডনি অপসারণের যে দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়েছে, তার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র বলছে, ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পরই তার ডান পা কেটে ফেলা হয়।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রেলওয়ে থানার (কমলাপুর) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জয়নাল আবেদীন গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এসব তথ্য জানান।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাত-আট মাস আগে পারিবারিক অভিমানের কারণে চট্টগ্রামের লোহাগড়া থানার নিজ বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে আসে রায়হান। পরে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে থাকতে শুরু করে সে। স্টেশনের শহরতলী প্ল্যাটফর্ম এলাকায় এলইইডিও এনজিও পরিচালিত পথশিশুদের স্কুলে নিয়মিত পড়াশোনা করত এবং সেখানেই দুপুরের খাবার খেত।
গত ১১ জুন ঢাকা থেকে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাওয়ার সময় ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয় রায়হান। এতে তার ডান পা ও মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে।
পরে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশের একটি টহল দল তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসকেরা তার অবস্থা গুরুতর বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
বিষয়টি জানতে পেরে বিমানবন্দর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের নির্দেশনায় রেলওয়ে পুলিশের সদস্য কনস্টেবল রিয়াজুল করিম হাসপাতালে উপস্থিত হন। পরে অ্যাম্বুলেন্সে রায়হানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) পাঠানো হয়। ১১ জুন বিকেলে নিটোরের এক্সট্রা-১৩ নম্বর বেডে তাকে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসা নথিপত্র অনুযায়ী, নিটোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎসকদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্তে ২ জুলাই রায়হানের দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ডান পা কেটে ফেলা হয়। অর্থাৎ, পা কর্তনের ঘটনাটি ট্রেন দুর্ঘটনার পরের চিকিৎসাপ্রক্রিয়ারই অংশ। তাকে জোর করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে পা কেটে দেওয়া হয়েছিল— এমন কোনো তথ্য চিকিৎসা নথিতে পাওয়া যায়নি।
কিডনি অপসারণের দাবিরও প্রমাণ নেই
রায়হানের একটি বা উভয় কিডনি অপসারণ করা হয়েছে— এমন দাবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি যাচাই করতে তার চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি ও আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হয়।
আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে রায়হানের উভয় কিডনি বিদ্যমান এবং স্বাভাবিক অবস্থায় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ফলে পর্যালোচনা করা চিকিৎসা নথির ভিত্তিতে কিডনি অপসারণের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।
চিকিৎসার পর আবার স্টেশনে
চিকিৎসা শেষে রায়হান আবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের শহরতলী প্ল্যাটফর্ম এলাকায় অবস্থান করছিল বলে জানা যায়।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জরিনা-মালির মা নামের এক নারীর টিনের ঘরে সে খাবার খেত। সেখানে একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে টাকা জমা রাখত বলেও জানা গেছে। প্ল্যাটফর্মের পানির লাইনে কর্মরত আলামিন ও ইয়াসিন এ তথ্য দিয়েছেন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পা কাটার আগে রায়হান মিনা ও রাজু নামের এক ভিডিও ধারণকারী দম্পতির সঙ্গে থাকত। পরে গত ১২ সেপ্টেম্বর জাকির নামের এক ব্যক্তি রায়হানকে পরিবারের কাছে পাঠানোর উদ্দেশ্যে যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি বাসে তুলে দেন বলে জানা যায়।
তবে এসব স্থানীয় বক্তব্যের স্বাধীন সমর্থনকারী নথি বা প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা বর্তমান তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসব তথ্যের কোনোটি এককভাবে রায়হানকে জোর করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করার অভিযোগও প্রমাণ করে না।
যাচাইয়ে মিলেছে যে চিত্র
রায়হানকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া দাবিগুলো মূলত তার ট্রেন দুর্ঘটনা, পা কেটে ফেলা এবং কিডনি অপসারণ ও জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে।
চিকিৎসা নথিতে ১১ জুনের ট্রেন দুর্ঘটনার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নিটোরে তার চিকিৎসার ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে ২ জুলাই তার ডান পা কাটা হয়।
অন্যদিকে, আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে উভয় কিডনি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকার তথ্য রয়েছে। একইভাবে, পা কেটে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করার দাবির পক্ষেও কোনো চিকিৎসা নথি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে দুর্ঘটনার আগে বা পরে রায়হান কার সঙ্গে থাকত, তার কাছ থেকে কেউ অর্থ নিত কি না কিংবা তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না— এসব বিষয় পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমান যাচাইয়ে রায়হানের পা কাটার ঘটনা ট্রেন দুর্ঘটনার পরের চিকিৎসাপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিপরীতে, কিডনি অপসারণ এবং পা কেটে জোর করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করার দাবির সত্যতা নিশ্চিত করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
রায়হানের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি ও আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট তথ্য যাচাইয়ের সহায়ক দলিল হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সময়ের আলো/জেডি