যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের বৈঠকে কৃষিপণ্য বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে। বিশেষ করে সয়াবিন, জোয়ারসহ বিভিন্ন মার্কিন কৃষিপণ্য চীনে রফতানি বাড়ানোর বিষয়ে আশাবাদী যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরা।
মার্কিন কৃষক সংগঠনগুলো চীনের কাছে আরও বেশি সয়াবিন, শস্য ও মাংসজাত পণ্য বিক্রির সুযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের ওপর চীনের পাল্টা শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে।
কৃষি খাতের জন্য চীনের বাজার গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বৈঠকে নতুন বড় কোনো ক্রয়চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং আগের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে দুই দেশ আবারও সম্মত হতে পারে।
সয়াবিন নিয়ে বড় চাপ
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সয়াবিন আমদানিকারক চীন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য রফতানি বাজারগুলোর একটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সয়াবিন রফতানির প্রায় অর্ধেকই চীনে গেছে।
তবে বাণিজ্যিক বিরোধের কারণে চীন ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো থেকে সয়াবিন কেনা বাড়িয়েছে। ফলে মার্কিন কৃষকদের জন্য চীনের বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়েছে।
ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কের জবাবে চীন বর্তমানে মার্কিন সয়াবিনসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ওপর ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বহাল রেখেছে। ব্রাজিলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর পণ্যে এই অতিরিক্ত শুল্ক না থাকায় মার্কিন সয়াবিন তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে।
একজন মার্কিন সয়াবিন রফতানিকারকের মতে, চীনের বেসরকারি ক্রেতারা মূলত এই অতিরিক্ত শুল্কের কারণেই মার্কিন পণ্য কেনা থেকে বিরত রয়েছে। শুল্ক তুলে নেওয়া হলে মার্কিন সয়াবিনের দাম ব্রাজিলের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
আগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মিশ্র ফল
গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে ট্রাম্প ও শি জিন পিংয়ের বৈঠক এবং চলতি বছরের মে মাসের আলোচনার পর চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য কেনা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, বছরে ২ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন সয়াবিন কেনার প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে রয়েছে চীন। তবে শস্য, মাংসসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য মিলিয়ে বছরে ১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মার্কিন কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি মৌসুমের জন্য চীনের কাছে প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টন মার্কিন সয়াবিন বিক্রির বিষয় নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়া ‘অজ্ঞাত গন্তব্যে’ বিক্রির প্রায় ৬০ লাখ টনের অন্তত অর্ধেক চীনের কেনা হতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকেরা।
তবে চলতি মৌসুমে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো ভুট্টা কেনেনি। জোয়ার কেনার পরিমাণও প্রত্যাশার তুলনায় কম।
কৃষকদের আরও বড় দাবি
মার্কিন কৃষি সংগঠনগুলো ট্রাম্পের কাছে চীনের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য ক্রয় প্রতিশ্রুতি আদায়ের আহ্বান জানিয়েছে।
ন্যাশনাল সরঘাম প্রডিউসারস চায়, চীন যেন প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫০ লাখ থেকে ৭০ লাখ মেট্রিক টন জোয়ার কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়। বাণিজ্যযুদ্ধের আগে চীন বছরে প্রায় ৪০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টন মার্কিন জোয়ার আমদানি করত।
এ ছাড়া চীনা মালিকানাধীন বা চীনা পরিচালিত জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে প্রবেশ করলে যে অতিরিক্ত ফি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, সেটিও পুনরায় চালু না করার আহ্বান জানিয়েছে কৃষি সংগঠনগুলো। বর্তমান স্থগিতাদেশ নভেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা, যা যুক্তরাষ্ট্রের ফসল কাটার মৌসুমের সঙ্গে মিলে যাবে।
ব্রাজিলের ওপর চীনের নির্ভরতা বাড়ছে
চীন ইতিমধ্যে ব্রাজিলসহ অন্যান্য দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য কিনছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে সয়াবিন উৎপাদন বাড়ায় চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের ভুট্টা পরিবহনে বাধা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে চীনের ভুট্টার চাহিদার একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যেতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
মার্কিন কৃষি সংগঠনগুলো দীর্ঘমেয়াদে চীনের সঙ্গে আরও স্থিতিশীল কৃষি বাণিজ্য সম্পর্ক চায়। এ জন্য সয়াবিন, জোয়ারসহ কৃষিপণ্যকে এমন কিছু পণ্যের তালিকায় রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর বাণিজ্য দুই দেশের অন্যান্য সংবেদনশীল ইস্যু নিয়ে আলোচনা চললেও অব্যাহত রাখা যাবে।
ট্রাম্প ও সি চিন পিংয়ের এবারের আলোচনায় প্রস্তাবিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বোর্ড নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ