নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা কূটনৈতিক আলোচনায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই হোয়াইট হাউসে বৈঠকে বসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। চলতি বছরে দুই নেতার এটি দ্বিতীয় বৈঠক।
বৃহস্পতিবারের (২৪ সেপ্টেম্বর) এই বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা ইস্যুসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিশ্বের দুই বড় শক্তির নেতাদের এই বৈঠক জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনকেও অনেকটা ছাপিয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে জাতিসংঘে যখন বহুপক্ষীয় আলোচনা চলছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো প্রভাবশালী দুই দেশের নেতারা নিজেদের মধ্যে সরাসরি বৈঠক করছেন। এ কারণে জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও বিশ্ব রাজনীতিতে এর গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের রিচার্ড গোয়ান বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের একই সপ্তাহে শি জিন পিংয়ের ওয়াশিংটনে যাওয়া এবং নিউইয়র্কে না আসা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এতে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে— বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আসলে কোথায় নেওয়া হচ্ছে?
আর্থিক সংকটে জাতিসংঘ
জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সংকট, বড় শক্তিগুলোর মধ্যে মতবিরোধ এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত মোকাবেলায় সীমিত প্রভাবের মতো সমস্যায় রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি সংস্থা থেকে বেরিয়ে গেছে এবং সংস্থাটিতে অর্থায়নও কমিয়েছে। এর ফলে জাতিসংঘের আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘের সচিবালয়ের বাজেট ৯ দশমিক ২ শতাংশ কমানো হয়েছে। এর পাশাপাশি হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই, শান্তিরক্ষী কমানো এবং মানবিক ও মানবাধিকার কার্যক্রমে ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি নিয়মিত বাজেটের জন্য ৭২৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। এর পরও নিয়মিত বাজেটে যুক্তরাষ্ট্রের আরও ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বকেয়া রয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদেও অচলাবস্থা
জাতিসংঘের সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়। নিরাপত্তা পরিষদেও দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়াসহ পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ইউজিন চেন বলেন, সংস্থাটির সামনে দুটি বড় সমস্যা রয়েছে। প্রথমটি হলো গুরুতর আর্থিক সংকট। দ্বিতীয়টি হলো, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ভূমিকা ও কার্যক্রম কেমন হওয়া উচিত—এ বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সংস্কারের জন্য মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে ‘ইউএন৮০’ নামে একটি সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে খরচ কমানো, একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা এবং তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল স্থানে কিছু কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সমালোচনা থাকলেও কূটনীতির বড় মঞ্চ জাতিসংঘ
জাতিসংঘ নিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও সাধারণ অধিবেশন এখনও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিলনস্থল। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এক হাজারের বেশি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও জাতিসংঘের অধিবেশনের সুযোগ নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাসও বলেছেন, জাতিসংঘ এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংঘাত প্রতিরোধ ও বন্ধ করার ক্ষেত্রে সংস্থাটি অনেক সময় অচল হয়ে পড়ে বলেও তিনি সমালোচনা করেছেন।
ট্রাম্প ও শি জিন পিংয়ের হোয়াইট হাউস বৈঠক জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের মধ্যেই বিশ্ব রাজনীতিতে দ্বিপক্ষীয় শক্তির প্রভাব এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ