হরমুজ প্রণালিতে দৃশ্যমান জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কমে গেলেও উপগ্রহের ছবিতে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। জাহাজের অবস্থান শনাক্তের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বন্ধ করে অনেক ট্যাংকার চলাচল করায় প্রকৃত তেল পরিবহনের পরিমাণ প্রচলিত ট্র্যাকিং তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকম জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মূল্যবান পণ্য পরিবহনকারী অনেক জাহাজ ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের এআইএস বা স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ করে রাখছে। ফলে প্রচলিত জাহাজ ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় এসব জাহাজকে দেখা যাচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সৌদি আরবের পূর্ব উপকূল থেকে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের পরিমাণ আগের মাসের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেড়েছে।
হরমুজে দৃশ্যমান জাহাজ মাত্র তিনটি
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র তিনটি পণ্যবাহী জাহাজকে দৃশ্যমানভাবে যেতে দেখা গেছে। এর আগের দিন এই সংখ্যা ছিল চারটি। অথচ গত ১০ দিনের গড় হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ১৫টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করেছে।
তবে জাহাজের এআইএস বন্ধ থাকলে সেটি প্রচলিত ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় আর দেখা যায় না। তাই দৃশ্যমান জাহাজের সংখ্যা কমে যাওয়াকে প্রকৃত জাহাজ চলাচলের সঠিক চিত্র হিসেবে ধরা যাচ্ছে না।
উপগ্রহের ছবি ব্যবহার করে এআইএস বন্ধ থাকা জাহাজও শনাক্ত করা সম্ভব। এ কারণে ট্যাংকারট্র্যাকার্সের তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালিতে প্রকৃত তেল পরিবহন দৃশ্যমান জাহাজের সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।
সৌদি আরবের তেল পরিবহনে পরিবর্তন
সম্প্রতি সৌদি আরবের বিকল্প তেল রপ্তানি পথ লোহিত সাগর দিয়ে পরিবহনে বাধা তৈরি হওয়ায় দেশটি পারস্য উপসাগরের বন্দরগুলো থেকে তেল পাঠানো বাড়িয়েছে।
ড্রোন হামলার কারণে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বা পেট্রোলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এই পাইপলাইন দেশটির পূর্বাঞ্চলের তেল উৎপাদন এলাকা থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহন করে।
মঙ্গলবার পাইপলাইনটি সীমিত পরিসরে আবার চালু হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যেই সৌদি আরামকো পূর্বাঞ্চলের উপসাগরীয় বন্দরগুলো থেকে তেল পরিবহন বাড়িয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর রাস তানুরা বন্দর থেকে সাতটি বিশাল তেলবাহী জাহাজে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল তোলা হয়।
কেন তথ্যে এত পার্থক্য?
হরমুজে মাত্র কয়েকটি জাহাজ দেখা গেলেও সৌদি আরবের তেল পরিবহন বেড়ে যাওয়ার তথ্য প্রথমে পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে। এর মূল কারণ হলো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করছে।
কেপলারসহ প্রচলিত জাহাজ ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত এআইএস সংকেত ও জাহাজের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে। কোনো জাহাজ এআইএস বন্ধ করলে সেটি তাদের নজরদারি থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে ট্যাংকারট্র্যাকার্স উপগ্রহের ছবি ও সরাসরি দৃশ্য শনাক্তকরণের মাধ্যমে জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। ফলে এআইএস বন্ধ থাকা জাহাজও তাদের নজরে আসতে পারে।
অর্থাৎ, ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৃশ্যমানভাবে মাত্র তিনটি জাহাজ যাওয়ার তথ্য থেকে বাস্তবে মাত্র তিনটি জাহাজই প্রণালিটি পার হয়েছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের জাহাজ চলাচলের এই পরিবর্তন তাই আন্তর্জাতিক তেল বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ