গতকাল ছিল বিশ্ব পর্যটন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘পর্যটনকে নতুনভাবে সাজাতে ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বজুড়ে পর্যটন খাত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এ পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের পর্যটন খাতকেও নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৬ সালের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে ১১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে ৯৮তম। এই ইনডেক্সে ৭-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩৪। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ সূচকে আমাদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। সূচকের এই অবস্থান আমাদের এই কথাই মনে করিয়ে দেয় যে, পর্যটনের সম্ভাবনা থাকা আর সেই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া এক বিষয় নয়।
বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, নদী, হাওড়, চা-বাগান, সুন্দরবন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আমাদের বড় সম্পদ। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে। এসব সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে কর্মসংস্থান বাড়বে। স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
সরকার ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটন খাতে একটি কার্যকর মহাপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। তবে কেবল পরিকল্পনা তৈরি করলেই হবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
পর্যটন খাতের উন্নয়নে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ৬০টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আমরা বলতে চাই, বড় প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট ও স্থানীয় উদ্যোগের প্রতিও নজর দিতে হবে। পর্যটনের মনোযোগ যেন শুধু কক্সবাজার, সুন্দরবন বা বড় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে না পড়ে। গ্রাম, হাওড়, নদী, চা-বাগান ও স্থানীয় সংস্কৃতিকেও পর্যটনের অংশ করতে হবে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী সরাসরি লাভবান হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের পর্যটনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমন্বিত একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দেশের পর্যটন গন্তব্য, আবাসন, পরিবহন, বুকিং, মূল্য এবং অন্যান্য সেবার তথ্য দেওয়া যেতে পারে। এতে পর্যটকরা নিজের পছন্দ ও বাজেট অনুযায়ী ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারবেন। এআই ব্যবহার করে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের গন্তব্যগুলো আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব। তবে তথ্য অবশ্যই নির্ভুল হতে হবে। এআইয়ের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসা বা গন্তব্যের অযাচিত প্রভাব বিস্তারের সুযোগও বন্ধ করতে হবে।
পর্যটনের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান নিরূপণে ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান, ভোগ, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া কঠিন। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া সঠিক নীতি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা যায় না। তাই একটি শক্তিশালী তথ্যভান্ডার এবং রিয়েল-টাইম পর্যটন ড্যাশবোর্ড তৈরি করা জরুরি।
পর্যটন খাতের সঙ্গে বহু মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা জড়িত। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে কোনো উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। পর্যটন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আনার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি দেশের পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টি ভুললে চলবে না। কোনো ভুল নীতির কারণে দেশের কোনো পর্যটনকেন্দ্রের প্রকৃতি নষ্ট হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হবে। সুন্দরবন, পাহাড়, নদী, হাওড় ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো শুধু টাকা আয়ের উপকরণ নয়। এগুলো আমাদের জাতীয় সম্পদ। তাই দায়িত্বশীল ও টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা অনেক। সেই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত শিল্পে রূপ দেওয়া জরুরি। সে জন্য মাস্টারপ্ল্যানের প্রয়োজন রয়েছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও কাজে লাগাতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। পর্যটনকে শুধু ভ্রমণ ও বিনোদনের খাত হিসেবে না দেখে কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও অর্থনীতির বহুমুখীকরণের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে