সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চারপাশে শব্দের যেন শেষ নেই। রাস্তায় যানজট, গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজ, জেনারেটরের শব্দ কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাইক। শহুরে জীবনে এসব শব্দ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু যে শব্দকে আমরা প্রতিদিনের জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিচ্ছি, তা দীর্ঘসময় ও অতিরিক্ত মাত্রায় শরীরের ওপর নানা ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী অতিরিক্ত পরিবেশগত শব্দ ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ, শ্রবণ সমস্যা, হৃদযন্ত্রের ঝুঁকি এবং শিশুদের বিকাশে বাধাগ্রস্ত করে।
সারাক্ষণ হর্নের শব্দে শরীরে কী হয়
হঠাৎ জোরে হর্ন বাজলে অনেকেই চমকে ওঠেন, বিরক্ত হন বা অস্বস্তি বোধ করেন। কিন্তু নিয়মিত উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলে বিষয়টি শুধু বিরক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শব্দ শরীরের স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া সক্রিয় করতে পারে। এর ফলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপের মতো শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি শব্দের সংস্পর্শে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ার প্রমাণও রয়েছে। বিশেষ করে যানজটপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘসময় অবস্থান করলে একদিকে হর্নের তীব্র শব্দ, অন্যদিকে যানজটের মানসিক চাপ মিলিয়ে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে মাথা ব্যথা, বিরক্তি, মনোযোগে ঘাটতি কিংবা মানসিক ক্লান্তিও দেখা দিতে পারে।
ঘুম নষ্ট হলে প্রভাব পড়ে সারা দিন
রাতের শব্দ শরীরকে পুরোপুরি বিশ্রামের সুযোগ না-ও দিতে পারে। গাড়ির শব্দ, জেনারেটর, নির্মাণকাজ কিংবা মাইকের আওয়াজে ঘুম বারবার ভেঙে গেলে পরদিন ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও মেজাজ খিটখিটে হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ঘুমের ব্যাঘাত হলে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে।
শুধু রাতের ঘুম নয়, দিনের কাজেও এর প্রভাব পড়ে। অফিসে একটানা কথাবার্তা, ফোনের রিং, যন্ত্রপাতির শব্দ কিংবা বাইরে যানবাহনের আওয়াজ থাকলে কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। ফলে মানসিক ক্লান্তি ও বিরক্তি বাড়তে পারে।
শিশু ও গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
দীর্ঘসময় অতিরিক্ত শব্দের সংস্পর্শে থাকা শিশুদের মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও দক্ষতার ওপর প্রভাব ফেলে থাকে। বিশেষ করে স্কুল ও পড়াশোনার পরিবেশে অতিরিক্ত শব্দ শেখার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারে। গর্ভাবস্থাতেও দীর্ঘসময় উচ্চ শব্দের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা ভালো।
মাথাব্যথা ও মানসিক চাপ কেন বাড়ে
অতিরিক্ত শব্দ মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে বারবার সতর্ক অবস্থায় রাখতে পারে। ফলে অস্বস্তি, বিরক্তি ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। যাদের মাইগ্রেন বা শব্দে সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে উচ্চ শব্দ মাথা ব্যথার ট্রিগার হতে পারে। তবে মাথা ব্যথার কারণ অনেক ধরনের হতে পারে, তাই বারবার বা তীব্র মাথা ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শব্দদূষণ থেকে কীভাবে সুরক্ষিত থাকবেন
নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা জায়গাগুলোতে শব্দ কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। ঘুমের সময় জানালা-দরজা বন্ধ রাখা, সম্ভব হলে বাসার অপেক্ষাকৃত শান্ত কক্ষ ব্যবহার করা এবং দীর্ঘসময় উচ্চ শব্দের উৎসের কাছে না থাকা উপকারী। হেডফোন বা ইয়ারফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত শব্দ এড়িয়ে চলা উচিত। শব্দদূষণ চোখে দেখা যায় না, তাই এর ক্ষতিও অনেক সময় তাৎক্ষণিক বোঝা যায় না। কিন্তু নিয়মিত উচ্চ শব্দের মধ্যে বসবাস বা কাজ করলে ঘুম, মানসিক স্বস্তি, মনোযোগ ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে পারে। তাই সুস্থ পরিবেশের অংশ হিসেবেই শব্দ নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি