সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ২৪টি অঙ্গরাজ্য ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ায় বিনোদনমূলক ক্যানাবিস বা গাঁজার ব্যবহার বৈধ করা হয়েছে। এর ফলে দেশটিতে গাঁজা সেবনের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন নাগরিক এই মাদক ব্যবহার করেন। তবে বৈধতা মানেই যে নিয়মিত গাঁজা সেবন নিরাপদ, তা নয়।
গবেষণায় গাঁজার নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য উঠে এসেছে। শুধু মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা ক্লান্তির মতো সাময়িক সমস্যা নয়, নিয়মিত গাঁজা সেবনের সঙ্গে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতারও সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এমনকি একটি গবেষণায় গাঁজা সেবনের সঙ্গে হৃদরোগের সম্পর্কের কথাও বলা হয়েছে।
অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মার্কো সলমি বলেন, ক্যানাবিসের কথা উঠলে অনেকের মনে বব মার্লের কথা আসে। তাদের ধারণা, এটি প্রাকৃতিক—প্রকৃতিরই অংশ— তাই এতে ক্ষতির কিছু নেই। কিন্তু ‘বিএমজে’তে প্রকাশিত তার পর্যালোচনায় ক্যানাবিস ব্যবহারের সঙ্গে নানা সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারিবিদ ডেবোরা হাসিন বলেন, ক্যানাবিস ওপিওয়েডের মতো বিপজ্জনক নয়। গাঁজা অতিরিক্ত সেবনে সাধারণত মানুষের মৃত্যু হয় না। তবে এর কারণে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আগের চেয়ে শক্তিশালী গাঁজা : বর্তমানে বাজারে পাওয়া গাঁজার অনেক জাত আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। শিকাগোর লুরি চিলড্রেনস হাসপাতালের মাদক ব্যবহার ও প্রতিরোধ কর্মসূচির চিকিৎসা পরিচালক মারিয়া রহমানদার সম্প্রতি ন্যাশনাল একাডেমিজ অব সায়েন্সেস, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিনের এক আলোচনায় বলেন, আজকের গাঁজা ‘দাদির আমলের গাঁজা’ নয়।
তার মতে, বর্তমানে পাওয়া ক্যানাবিসজাত পণ্য অনেক বেশি শক্তিশালী। একই সঙ্গে এগুলো নানা ধরনের উপাদান ও ব্যবহারের পদ্ধতিতে বাজারে আসছে। ফলে ষাট দশক, এমনকি নব্বই দশকের গাঁজার সঙ্গে আজকের পণ্যের যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
বর্তমানে ক্যানাবিস ব্যবহারের ধরনও শরীরে এর সক্রিয় উপাদান টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনলের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। রহমানদার বলেন, ধূমপানের জন্য জয়েন্ট বানিয়ে গাঁজা সেবনের তুলনায় ভ্যাপিং ও খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার মাধ্যমে সাধারণত বেশি মাত্রায় ‘টিএইচসি’ শরীরে প্রবেশ করে।
মস্তিষ্কে ক্যানাবিসের প্রভাব : নিয়মিত ক্যানাবিস ব্যবহারের তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত কিন্তু উদ্বেগজনক একটি ঝুঁকি হলো— মাদক-প্ররোচিত সাইকোসিস। এ অবস্থায় একজন ব্যক্তি বিভ্রম বা অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতায় ভুগতে পারেন, কণ্ঠস্বর শুনতে পারেন এবং সাময়িকভাবে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে এ সমস্যা কমে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
সলমির মতে, মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায় এমন বিভিন্ন মাদক থেকে এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। তবে ক্যানাবিস ব্যবহারে এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য।
তিনি বলেন, প্রতিদিন ক্যানাবিস ব্যবহার করলে মাদক-প্ররোচিত সাইকোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। তবে কতটা পরিমাণ সেবন করলে এ ঝুঁকি থাকবে না— এমন কোনো নিরাপদ মাত্রা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক ও পুরুষদের মধ্যে এ ঝুঁকি বেশি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মাদক-প্ররোচিত সাইকোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে স্থায়ী মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।
পর্যবেক্ষণভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণায় ঘনঘন ক্যানাবিস ব্যবহারের সঙ্গে অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যারও সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সলমির পর্যালোচনায় বিষণ্নতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রেমের সম্পর্কের মধ্যে সহিংসতার প্রবণতা বাড়ার কথাও উঠে এসেছে। ক্যানাবিস মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে মাদক গ্রহণের পর গাড়ি চালালে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্রে দশম শ্রেণির প্রায় ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্যানাবিস ব্যবহারের কথা জানিয়েছে, যদিও কোনো অঙ্গরাজ্যেই ২১ বছরের কম বয়সিদের জন্য এটি বৈধ নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ক্যানাবিস ব্যবহারকারী কিশোর-কিশোরীদের তরুণ বয়সে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ব্যবহার না করা কিশোরদের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেশি। তাদের মধ্যে আত্মহত্যার হারও বেশি।
রহমানদার বলেন, কৈশোরে মস্তিষ্ক পরিপক্ব হওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এ সময় মাদক গ্রহণ করলে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় মস্তিষ্কে তার প্রভাব বেশি পড়তে পারে।
ক্যানাবিসে আসক্তির ঝুঁকি : অনেকের ধারণা, অ্যালকোহলের তুলনায় ক্যানাবিস নিরাপদ। কিন্তু গবেষণা বলছে, প্রতি পাঁচজন ক্যানাবিস ব্যবহারকারীর মধ্যে একজন এতে আসক্ত হয়ে পড়তে পারেন। ক্যানাবিস ব্যবহারের কারণে তৈরি হওয়া আসক্তির লক্ষণ অন্য অনেক মাদকের আসক্তির মতোই।
হাসিন বলেন, কারও যদি ক্যানাবিসের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, একই প্রভাব পেতে ক্রমে আরও বেশি পরিমাণ সেবনের প্রয়োজন হয়, কিংবা ছেড়ে দেওয়া বা কমানোর চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়— তাহলে সেটি সতর্ক হওয়ার লক্ষণ।
ক্যানাবিসের আসক্তি ব্যক্তিগত, আর্থিক, আইনি ও স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যার কারণ হতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আসক্তির ঝুঁকি আরও বেশি। হাসিনের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সেনাসদস্যদের মধ্যে ক্যানাবিস আসক্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর পেছনে ক্যানাবিসের শক্তিমাত্রা বৃদ্ধি, এর বৈধতার কারণে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়া এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে অনেকের নিজে নিজে চিকিৎসা হিসেবে এটি ব্যবহার করার প্রবণতা— এসব কারণ থাকতে পারে।
তরুণদেরও ক্যানাবিস ব্যবহারে আসক্তির ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে যারা অল্প বয়সে এটি ব্যবহার শুরু করে অথবা যাদের পরিবারে আসক্তির ইতিহাস রয়েছে, তাদের ঝুঁকি বেশি। সলমি বলেন, ২৫ বছরের কম বয়সিদের ক্যানাবিস থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা উচিত। কারণ ক্যানাবিস শরীরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, তা আগে থেকে বলা কঠিন। এতে মস্তিষ্ক ও স্বাস্থ্যের ওপর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানাবিসকে সম্পূর্ণ নিরীহ পদার্থ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অধিকাংশ ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা নাও হতে পারে, কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারে কার মধ্যে জটিলতা তৈরি হবে, তা আগে থেকে নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব নয়।
সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে