১০০ বছর পর নতুন পেঙ্গুইন প্রজাতি

সময়ের আলো ডেস্ক

বিবিধ

এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর পেঙ্গুইনের নতুন একটি প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ফ্রান্সের কেরগেলেন দ্বীপপুঞ্জে পাওয়া গেন্টু পেঙ্গুইনের একটি জনগোষ্ঠীকে

2026-09-28T01:31:37+00:00
2026-09-28T01:31:37+00:00
 
  সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিবিধ
১০০ বছর পর নতুন পেঙ্গুইন প্রজাতি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩১ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর পেঙ্গুইনের নতুন একটি প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ফ্রান্সের কেরগেলেন দ্বীপপুঞ্জে পাওয়া গেন্টু পেঙ্গুইনের একটি জনগোষ্ঠীকে আলাদা প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। দুর্গম এই দ্বীপপুঞ্জ স্থায়ীভাবে বসবাসযোগ্য কোনো ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২ হাজার মাইল দূরে। চিলি ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির গবেষকদের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক দল এই গবেষণা করেছে। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে কমিউনিকেশনস বায়োলজি সাময়িকীতে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এতদিন একটি প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত গেন্টু পেঙ্গুইন আসলে চারটি আলাদা প্রজাতি। এর মধ্যে কেরগেলেন দ্বীপপুঞ্জের জনগোষ্ঠীটিকে আগে কখনো আলাদা প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। দেখতে নতুন প্রজাতির পেঙ্গুইন অন্য গেন্টুদের মতোই। শরীরের নিচের অংশ সাদা এবং পিঠ কালো। আকার ও ডাকের ক্ষেত্রে সামান্য পার্থক্য থাকলেও খালি চোখে তাদের আলাদা করা কঠিন।

তবে জিনগত পরীক্ষায় স্পষ্ট পার্থক্য পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা এমন প্রাণীকে ‘ক্রিপটিক প্রজাতি’ বলেন, যাদের দেখতে কাছাকাছি হলেও জিনগতভাবে তারা আলাদা। নতুন শনাক্ত হওয়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় গেন্টু পেঙ্গুইনের বৈজ্ঞানিক নাম Pzgoscelis kerguelensis।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আগে গেন্টু পেঙ্গুইনের তিনটি জনগোষ্ঠীকে উপপ্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও জিনগত পার্থক্যের কারণে সেগুলোকে এখন পূর্ণ প্রজাতি হিসেবে ধরা যায়।

১০০ বছরের বিতর্ক : গেন্টু পেঙ্গুইনের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ ছিল। বিভিন্ন গবেষণায় এদের ছয়টি পর্যন্ত উপপ্রজাতির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কোনগুলো আলাদা প্রজাতি, তা নিয়ে একমত হতে পারেননি গবেষকরা। নতুন গবেষণায় ১০টি প্রজনন উপনিবেশের ৬৪টি পেঙ্গুইনের পুরো জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি পেঙ্গুইনগুলোর শরীরের গঠন, রং, ডাক, প্রজননের সময়, খাদ্য ও খাবার সংগ্রহের আচরণও পরীক্ষা করা হয়।

গবেষকদের মতে, জিনগত, শারীরিক ও আচরণগত তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার ফলে গেন্টু পেঙ্গুইনের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেছে।

চার প্রজাতির চার ঠিকানা : নতুন গবেষণা অনুযায়ী, চার প্রজাতির গেন্টু পেঙ্গুইন দক্ষিণ গোলার্ধের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে আছে। Pzgoscelis kerguelensis বা পূর্বাঞ্চলীয় গেন্টু পেঙ্গুইন ক্রোজে, ম্যারিয়ন ও ম্যাককোয়ারি দ্বীপে পাওয়া যায়। দক্ষিণ আমেরিকার ফকল্যান্ড বা মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ এবং মার্তিয়ো দ্বীপে রয়েছে উত্তরাঞ্চলীয় গেন্টু পেঙ্গুইন, Pzgoscelis kerguelensis।

নতুন শনাক্ত হওয়া Pzgoscelis kerguelensis কেরগেলেন দ্বীপ ও সম্ভবত কাছের হার্ড দ্বীপ এলাকায় বসবাস করে। এদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। আর দক্ষিণাঞ্চলীয় গেন্টু চুমড়ংপবষরং বষষংড়িৎঃযর পাওয়া যায় অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপ, অ্যান্টার্কটিকার উপকূল ও দক্ষিণ জর্জিয়া দ্বীপে। চার প্রজাতির মধ্যে এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

আলাদা হলো কীভাবে? : গবেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন আলাদা এলাকায় বসবাসের কারণেই গেন্টু পেঙ্গুইনের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিনগত পার্থক্য তৈরি হয়েছে। প্রায় ৩-৫ লাখ বছর আগে চার প্রজাতির গেন্টু আলাদা পথে বিবর্তিত হতে শুরু করে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি দক্ষিণ মহাসাগরের অ্যান্টার্কটিক পোলার ফ্রন্টও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই সীমারেখায় সমুদ্রের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততায় বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ফলে বিভিন্ন এলাকার পেঙ্গুইনের মধ্যে চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ সময় ধরে আলাদা পরিবেশে বসবাস করার কারণে প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজেদের এলাকার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে জিনগত পার্থক্য এতটাই বেড়ে যায় যে তারা আলাদা প্রজাতিতে পরিণত হয়।

খাবারে বৈচিত্র্য গেন্টুর সুবিধা : গেন্টু পেঙ্গুইনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তাদের খাবারের তালিকা বেশ বড়। মাছ, ক্রিল, স্কুইড ও কাটলফিশসহ পানির নিচে পাওয়া বিভিন্ন প্রাণী তারা খায়। এক ধরনের খাবারের ওপর নির্ভরশীল না হওয়ায় পরিবেশ পরিবর্তনের সঙ্গে তারা তুলনামূলক সহজে মানিয়ে নিতে পারে। 

বিশেষ করে সমুদ্রে ক্রিলের পরিমাণ কমে গেলে এই বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস তাদের সুবিধা দেয়। অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপে গেন্টু পেঙ্গুইনের সংখ্যা বাড়লেও একই এলাকায় থাকা এমপেরর ও অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের কিছু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমছে। গবেষকদের মতে, খাবারের এই বৈচিত্র্য গেন্টু পেঙ্গুইনের বিভিন্ন দ্বীপ ও অঞ্চলে টিকে থাকার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছে।

জিনে পাওয়া গেল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার তথ্য : গবেষণায় পেঙ্গুইনের জিনোমের হাজার হাজার জিনগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রজাতি তাদের নিজ নিজ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে জিনগতভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। অ্যান্টার্কটিকায় বসবাসকারী দক্ষিণাঞ্চলীয় গেন্টুর জিনে তাপ উৎপাদন, চর্বি সংরক্ষণ ও আলো দেখার সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন পাওয়া গেছে। অ্যান্টার্কটিকার তীব্র ঠান্ডা এবং বছরের বিভিন্ন সময়ে দিনের আলোর বড় পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এসব বৈশিষ্ট্য কাজে লাগতে পারে।

পূর্বাঞ্চলীয় গেন্টুর জিনে কার্বোহাইড্রেট ব্যবহারের দক্ষতা এবং পানির নিচে ডুব দেওয়ার ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য বেশি পাওয়া গেছে। এসব বৈশিষ্ট্য তাদের দীর্ঘ সময় পানির নিচে খাবার খুঁজতে সাহায্য করতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলীয় গেন্টুর ক্ষেত্রে হজম, হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম ও পেশির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য বেশি দেখা গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে দ্বীপের পেঙ্গুইন ঝুঁকিতে : গবেষকরা ২০৫০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের মডেল অনুযায়ী দ্বীপে বসবাসকারী কিছু গেন্টু প্রজাতি ভবিষ্যতে উপযুক্ত আবাসস্থল হারাতে পারে। সমস্যা হলো, এসব পেঙ্গুইন যে দ্বীপগুলোতে থাকে সেগুলোর আশপাশে বিকল্প আবাসস্থল সবসময় পাওয়া যাবে না। পরিবেশ বদলে গেলে অন্য এলাকায় চলে যাওয়াও তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।

অন্যদিকে অ্যান্টার্কটিকায় বসবাসকারী গেন্টুর জন্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপযুক্ত আবাসস্থল আরও দক্ষিণে বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


তবে এমপেরর, অ্যাডেলি ও চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি পড়তে পারে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। সমুদ্রের বরফ কমে গেলে বরফের নিচে বেড়ে ওঠা ক্রিলের ওপরও প্রভাব পড়বে। এতে এসব পেঙ্গুইনের খাবারের সংকট তৈরি হতে পারে।

পেঙ্গুইনের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি আরও কিছু হুমকি রয়েছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আবাসস্থল ধ্বংস, ইঁদুর ও কুকুরের মতো প্রাণীর আক্রমণ, বাণিজ্যিক মাছ ধরার সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং মাছ ধরার জালে দুর্ঘটনাবশত আটকে পড়াও বিভিন্ন পেঙ্গুইন জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। ছোট দ্বীপে সীমিত এলাকায় বসবাসকারী পেঙ্গুইনের ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ পরিবেশ বদলে গেলে তাদের অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার সুযোগ কম।

গবেষক জুলিয়ানা ভিয়ানা মনে করেন, গেন্টুর তিনটি সাব-অ্যান্টার্কটিক প্রজাতি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংরক্ষণেও কাজে আসবে জিনগত তথ্য : এই গবেষণায় তৈরি হওয়া বড় জিনগত তথ্যভান্ডার ভবিষ্যতে পেঙ্গুইন সংরক্ষণেও কাজে লাগতে পারে। গবেষকরা এখন পেঙ্গুইনের জিনে এমন বৈশিষ্ট্য খুঁজছেন, যা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু থেকে বেঁচে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো জনগোষ্ঠী রোগটির বিরুদ্ধে বেশি প্রতিরোধী কি না কিংবা কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে— এ ধরনের তথ্য জানা গেলে সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরিতে তা ব্যবহার করা যেতে পারে।

গবেষকদের মতে, পুরো জিনোম বিশ্লেষণ এখন শুধু প্রাণীর বিবর্তন বা নতুন প্রজাতি শনাক্ত করার কাজে সীমাবদ্ধ নেই। বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণেও এর ব্যবহার বাড়ছে। এক শতাব্দীর বেশি সময় পর নতুন গেন্টু পেঙ্গুইন প্রজাতির সন্ধান তাই পেঙ্গুইন গবেষণায় নতুন তথ্য যোগ করেছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্যান্য হুমকির মধ্যে এসব প্রজাতিকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, সে বিষয়েও গবেষকদের হাতে নতুন তথ্য এসেছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   পেঙ্গুইন  প্রজাতি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: