‘কোনও বাস্তব সমস্যা নয়’, মেলোনির বোরকা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনায় ইতালির মুসলিমরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্কুলে বোরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়ার পর দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশ এ সিদ্ধান্ত

2026-09-29T18:23:11+00:00
2026-09-29T18:23:11+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
‘কোনও বাস্তব সমস্যা নয়’, মেলোনির বোরকা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনায় ইতালির মুসলিমরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২৩ পিএম 
উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মুলাইকা লরা এনরিয়েল্লো বলেন, রাজনীতিকরা তাদের বিভাজনমূলক বক্তব্যের আড়ালে থাকা মানুষগুলোর কথা ভুলে যান। ছবি : আল-জাজিরা
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্কুলে বোরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়ার পর দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশ এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য, খুব অল্পসংখ্যক মুসলিম নারী এই পোশাক পরেন। ফলে এটিকে বড় জাতীয় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে বাস্তব পরিস্থিতিকে বিকৃত করা হচ্ছে। 

মিলানের আল-ওয়াহিদ মসজিদে শুক্রবারের নামাজে আসা মুসল্লিদের অনেকেই সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছেন। 

৫৮ বছর বয়সী উচ্চবিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক মুলাইকা লরা এনরিয়েল্লো বলেন, তিনি দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে কখনও কোনো শিক্ষার্থীকে পুরো মুখ ঢেকে রাখা পোশাক পরে স্কুলে আসতে দেখেননি। কিছু ছাত্রী হিজাব পরলেও সেটি নিয়ে স্কুলে কোনো সমস্যা হয় না বলে জানান তিনি। 

তিনি বলেন, যে মেয়েরা স্কুলে হিজাব পরতে চায়, তারা তা পরে। শিক্ষক বা অন্য কোনো শিক্ষার্থী তাদের বিরক্ত করে না। 
 
মেলোনির যুক্তি

রোববার তার জাতীয়তাবাদী ও রক্ষণশীল দল ব্রাদার্স অব ইতালির (এফডিআই) এক সমাবেশে মেলোনি প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞার কথা জানান। 

মেলোনির যুক্তি, স্কুলে শিক্ষার্থীদের মুখ খোলা থাকা উচিত এবং কোনো ‘বাস্তব বা কথিত ঐতিহ্যের’ কারণে কোনো তরুণীকে নিজের মুখ ঢেকে রাখতে বাধ্য করা উচিত নয়। তিনি বিষয়টিকে নারী-পুরুষের সমতার সঙ্গেও যুক্ত করেছেন।

ইতালির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনসার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ জন নারী শিক্ষার্থী নিকাব পরেন।

এনরিয়েল্লোর মতে, এত কমসংখ্যক শিক্ষার্থীকে কেন্দ্র করে এমন আইন করা মানবিক নয়। 

তিনি বলেন, কোনো ছাত্রী বোরকা পরে স্কুলে এলে তাকে বাড়ি পাঠানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। বরং তাকে এমন একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখতে হবে, যে হয়তো মনে করছে সে সঠিক কাজই করছে। 

‘একটি ভুয়া সমস্যা’

আল-ওয়াহিদ মসজিদের ইমাম ইয়াহিয়া পাল্লাভিচিনি সরকারের উদ্যোগকে একটি ভুয়া সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তার মতে, মুসলিম সমাজের খুব ছোট একটি অংশের ব্যবহার করা পোশাককে সামনে এনে জনসাধারণের দৃষ্টি ইসলামের একটি নির্দিষ্ট দিকের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। 

ইতালিয়ান ইসলামিক রিলিজিয়াস কমিউনিটির ভাইস প্রেসিডেন্টও পাল্লাভিচিনি বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের একটি ছোট অংশকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেন তারা ইতালীয় সমাজের জন্য সমস্যা।

শুধু ইতালিতেই নয়

মুসলিম নারীদের পোশাককে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে তুলে ধরার ঘটনা শুধু ইতালিতে নয়, ইউরোপের অন্য দেশেও দেখা গেছে।

গত সপ্তাহে ইতালির পপুলিস্ট লিগ পার্টির বার্ষিক সমাবেশে ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী সংগঠন ‘কালেকটিফ নেমেসিসের’ নারী কর্মীরা মঞ্চে পুরো মুখ ঢাকা পোশাক খুলে প্রতিবাদ করেন। দর্শকদের অনেকে তখন স্বাধীনতা বলে স্লোগান দেন।  

পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক রেনাতা পেপিচেলি বলেন, এই ঘটনাটি ১৯৫৮ সালে আলজেরিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের সময়কার কিছু ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন কিছু আলজেরীয় নারী প্রকাশ্যে তাদের পর্দা খুলেছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে তাদের ওপর চাপও ছিল।

তার মতে, মুসলিম নারীদের পর্দা এখনও রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে আছে। 

আইন কী বলছে?

মেলোনি সরকারের প্রস্তাবে সরাসরি ‘বোরকা’ বা ‘নিকাব’ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। বরং স্কুলে এমন কোনো পোশাক পরে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে, যাতে পুরো মুখ ঢাকা থাকে বা ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হয়। 

বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনবিষয়ক গবেষক নিকো টন্টির মতে, নির্দেশনাটি কার্যকর হলেও পার্লামেন্ট এর প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে পর্যালোচনা করতে পারে।

ইতালির আইনে এরই মধ্যে এমন পোশাক পরার ওপর কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে, যেগুলো ব্যক্তিকে শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে। তবে যৌক্তিক কারণ থাকলে তার ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে।


টন্টির মতে, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জনশৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে ইতালিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। আদালতের বিভিন্ন রায়ে ধর্মীয় অনুশীলনকে এমন একটি যৌক্তিক কারণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা কিছু ক্ষেত্রে শাস্তি থেকে ছাড় দিতে পারে।

ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীর চাপ

বিশ্লেষকদের মতে, মেলোনির এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে।

২০২৭ সালের নির্বাচন সামনে রেখে মেলোনি এখন ডানপন্থী দিক থেকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। সাবেক জেনারেল রবার্তো ভান্নাচ্চির ন্যাশনাল ফিউচার পার্টি জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। ফেব্রুয়ারিতে দলটি গঠনের পর বিভিন্ন জনমত জরিপে তাদের সমর্থন প্রায় ৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

লুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের অধ্যাপক লরেঞ্জো কাস্তেলানি মনে করেন, মেলোনি ডানপন্থী ও জাতীয়তাবাদী ভোটারদের কাছে আরও কঠোর অবস্থানের বার্তা দিতে চাইছেন।

তার মতে, অভিবাসন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আগামী নির্বাচনে মেলোনির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।

অভিবাসন ও নিরাপত্তার মতো ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনি নিজের সমর্থকদের ধরে রাখতে চাইছেন এবং একই সঙ্গে ভান্নাচ্চিকে পরিচয় ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জায়গাটি পুরোপুরি দখল করতে দিতে চাইছেন না— এমন বিশ্লেষণ দিয়েছেন কাস্তেলানি।

ইতালিতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাস থাকলেও মেলোনির সরকার এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকার। চলতি মাসের শুরুতে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনির টানা ১,৪১২ দিন ক্ষমতায় থাকার রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছেন। 

কাস্তেলানির মতে, আগামী নির্বাচনে মেলোনি এই দীর্ঘস্থায়ী সরকার পরিচালনার বিষয়টিও নিজের রাজনৈতিক প্রচারণায় তুলে ধরতে পারেন। তিনি অভিবাসন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরকারের ধারাবাহিকতাকে যুক্ত করে ভোটারদের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করবেন।

সূত্র : আল-জাজিরা 

সময়ের আলো/ইউএমএইচ


  বিষয়:   জর্জিয়া মেলোনি  ইতালি  প্রধানমন্ত্রী  মুসলিম 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: