জান্নাত-জাহান্নামের ফয়সালা যার হাতে

মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি

ইসলাম

মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে অবধারিত সত্য। আজ যে মানুষটি আমাদের সামনে হাসছেন, কথা বলছেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে ব্যস্ত আছেন, কাল তিনিই

2026-10-02T12:05:21+00:00
2026-10-02T12:05:21+00:00
 
  শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬,
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
ইসলাম
জান্নাত-জাহান্নামের ফয়সালা যার হাতে
মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে অবধারিত সত্য। আজ যে মানুষটি আমাদের সামনে হাসছেন, কথা বলছেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে ব্যস্ত আছেন, কাল তিনিই হয়তো এই দুনিয়া ছেড়ে মাটির নিচে শায়িত হবেন। দুনিয়ার জীবন যতই দীর্ঘ মনে হোক, একদিন প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। 

কিন্তু মৃত্যুর পর কী হবে? তার স্থায়ী ঠিকানা কোথায় হবে— জান্নাত নাকি জাহান্নাম? এ প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ অনেক সময় অন্যের বাহ্যিক আমল, পোশাক, কথা, আচরণ কিংবা কোনো একটি ভুল দেখে তার পরিণতি সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করে বসে। অথচ মানুষের বাহ্যিক অবস্থা আমরা যতটুকু দেখি, আল্লাহ তায়ালা তার চেয়ে অনেক বেশি জানেন। 

আমরা একজন মানুষের বর্তমান দেখি; কিন্তু তার শেষ পরিণতি জানি না। আমরা তার প্রকাশ্য আমল দেখি; কিন্তু তার অন্তরের অবস্থা জানি না। তাই কোনো ব্যক্তিকে দেখে নিশ্চিতভাবে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলে দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন মুমিনের অত্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি। কুরআন-সুন্নাহ আমাদের শেখায়— আল্লাহর রহমতের আশা করতে হবে, তাঁর শাস্তিকে ভয় করতে হবে এবং নিজের আমল ও পরিণতি নিয়ে চিন্তা করতে হবে।

হিসাব ও বিচার একমাত্র আল্লাহর
আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে। অতঃপর তাদের হিসাব গ্রহণের দায়িত্বও আমারই’ (সুরা আল-গাশিয়াহ, আয়াত : ২৫-২৬)। 

এই আয়াত মানুষের জীবনের একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে— চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন আল্লাহর কাছেই এবং চূড়ান্ত হিসাবও তাঁর কাছেই। দুনিয়াতে মানুষ বিচার করতে পারে, আদালত শাস্তি দিতে পারে, সমাজ কাউকে ভালো বা মন্দ বলতে পারে; কিন্তু মানুষের অন্তর, নিয়ত, গোপন আমল এবং জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর। 

কেউ হয়তো মানুষের চোখে অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ, কিন্তু আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা অনেক বেশি। আবার কেউ বাহ্যিকভাবে অত্যন্ত ধার্মিক বলে পরিচিত হলেও তার অন্তরে অহংকার, রিয়া কিংবা অন্য কোনো গোপন ব্যাধি থাকতে পারে। তাই মানুষের বাহ্যিক অবস্থার ভিত্তিতে চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণের অধিকার আমাদের নেই। আমাদের দায়িত্ব হলো সৎকাজের প্রতি উৎসাহ দেওয়া, অন্যায় থেকে সতর্ক করা এবং নিজের পরিণতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

মানুষ বাহ্যিকতা দেখে, আল্লাহ অন্তর দেখেন
মানুষ সাধারণত বাহ্যিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে অন্যকে মূল্যায়ন করে। কারও পোশাক, কথাবার্তা, সামাজিক পরিচয়, কিছু ভালো কাজ কিংবা কিছু ভুলের ওপর ভিত্তি করে আমরা তার সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করি। কিন্তু মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে তার অন্তরে কী আছে, তা আমরা জানি না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না; কে তাকওয়াবান, তিনিই সর্বাধিক জানেন’ (সুরা আন-নাজম, আয়াত : ৩২)। 

এই আয়াত আমাদের আত্মপ্রশংসা ও অন্যকে ছোট করার মানসিকতা থেকে সতর্ক করে। একজন মানুষ নিজেকে যতই নেককার মনে করুক, তার প্রকৃত মর্যাদা আল্লাহই জানেন। একইভাবে কাউকে বাহ্যিক কোনো দুর্বলতার কারণে চূড়ান্তভাবে নিকৃষ্ট মনে করাও সঠিক নয়। কারণ মানুষের আমলের পাশাপাশি নিয়তও গুরুত্বপূর্ণ। একই কাজ দুই ব্যক্তি করলে একজন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে, অন্যজন নিয়তের ত্রুটির কারণে সেই মর্যাদা নাও পেতে পারে।

আজকের পাপী আগামী দিনের তওবাকারী 
কোনো ব্যক্তি আজ গুনাহে লিপ্ত— এ কারণে তার ভবিষ্যৎও গুনাহে পরিপূর্ণ থাকবে, এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। মানুষের জীবনে পরিবর্তনের দরজা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খোলা থাকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না’ (সুরা আয-যুমার, আয়াত : ৫৩)। 

কত মানুষ জীবনের একটি পর্যায়ে ভুল পথে ছিল, পরে তওবা করে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত হয়েছে। তাই কোনো পাপীকে দেখে তাকে চিরস্থায়ীভাবে ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ বা ‘জাহান্নামি’ বলে দেওয়া উচিত নয়। বরং তার প্রতি সংশোধনের আহ্বান জানানো, তাকে তওবার পথে উৎসাহিত করা এবং আল্লাহর রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই একজন মুমিনের দায়িত্ব। একজন মানুষকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে সেটিই দাওয়াতের সফলতা। কাউকে অপমান করে দূরে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে তাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।


আজকের নেককারেরও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই
অন্যদিকে কেউ বর্তমানে অনেক ইবাদত করছে, বহু নেক আমল করছে— এ কারণে নিজের জান্নাত নিশ্চিত মনে করারও সুযোগ নেই। কারণ মানুষের জীবনের শেষ পরিণতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমলের মূল্যায়ন হয় শেষ অবস্থার ওপর’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৬০৭)। এই হাদিস মুমিনকে আত্মতুষ্টি থেকে সতর্ক করে। কেউ অনেক আমল করলেই সে নিরাপদ— এমন ধারণা যেমন ঠিক নয়, তেমনি সামান্য দুর্বলতার কারণে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়াও ঠিক নয়। একজন মুমিনের উচিত আমল করার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে কবুলিয়াত প্রার্থনা করা। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঈমান, ইখলাস ও নেক আমলের ওপর অটল থাকার জন্য দোয়া করা। কারণ আসল সফলতা শুধু ভালোভাবে জীবন কাটানো নয়; বরং ঈমানের সঙ্গে সুন্দর পরিণতি লাভ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাহ্যিক আমল দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিপজ্জনক
সহিহ বুখারির একটি বিখ্যাত ঘটনায় দেখা যায়, এক ব্যক্তি মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধে অসাধারণ সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন। তার বীরত্ব দেখে মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। কিন্তু তার পরিণতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শেষ পর্যন্ত সে আত্মহত্যা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন মানুষের বাহ্যিক ধারণার বিপরীতে তার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, কোনো ব্যক্তি মানুষের দৃষ্টিতে জান্নাতিদের মতো আমল করতে পারে, অথচ তার পরিণতি জাহান্নামের দিকে হতে পারে; আবার কেউ মানুষের দৃষ্টিতে জাহান্নামিদের মতো আমল করলেও তার পরিণতি জান্নাতের হতে পারে (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৬০৭)। এই ঘটনা আমাদের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। মানুষের চোখে একটি নির্দিষ্ট সময়ের আমল যতই ভালো বা খারাপ মনে হোক, জীবনের শেষ অধ্যায় কীভাবে লেখা হবে তা আমরা জানি না। তাই কারও বর্তমান অবস্থা দেখে তার চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে অহংকারের সঙ্গে ঘোষণা দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

কাউকে কাফির বলা অত্যন্ত ভয়ংকর বিষয়
ইসলামে ঈমানের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে ‘হে কাফির’ বললে তা তাদের দুজনের একজনের ওপর বর্তায় (সহিহ মুসলিম, হািদস : ৬০)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, যেকোনো মুমিনকে কুফরের অপবাদ দেয়, সে যেন তাকে হত্যা করার মতো গুরুতর অপরাধ করল (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১০৫)। এ কারণে কাউকে কাফির বলা কোনো সাধারণ কথাবার্তার বিষয় নয়। আকিদা, ঈমান ও কুফরের মতো গুরুতর বিষয়ে অজ্ঞতা, আবেগ, ব্যক্তিগত রাগ কিংবা দলীয় বিরোধের ভিত্তিতে মন্তব্য করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ ধরনের বিষয়ে সুস্পষ্ট শরয়ি জ্ঞান, প্রমাণ ও যোগ্য আলেমের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। একজন সাধারণ মুসলমানের জন্য নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখা এবং অযথা কঠিন ফয়সালা থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ।

মুমিনের জীবনে রহমতের আশা ও শাস্তির ভয়
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার বান্দাদের জানিয়ে দিন, নিশ্চয়ই আমিই পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর আমার শাস্তিই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (সুরা আল-হিজর, আয়াত : ৪৯-৫০)। এই দুটি আয়াত মুমিনের জীবনের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান শিক্ষা দেয়। একদিকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না, অন্যদিকে তাঁর শাস্তিকে হালকা করে দেখাও যাবে না। শুধু রহমতের কথা চিন্তা করে গুনাহে নির্ভীক হয়ে যাওয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি শুধু শাস্তির ভয়ে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়াও সঠিক নয়। মুমিনের হৃদয়ে থাকবে আল্লাহর রহমতের আশা, তাঁর শাস্তির ভয় এবং সেই অনুযায়ী নেক আমল করার চেষ্টা। এই ভারসাম্য মানুষকে একদিকে আত্মতুষ্টি থেকে রক্ষা করে, অন্যদিকে হতাশা থেকেও বাঁচায়।

অন্যের হিসাব নয়, নিজের হিসাব করুন
মানুষের একটি বড় দুর্বলতা হলো— সে নিজের ভুলের চেয়ে অন্যের ভুল দেখতে বেশি আগ্রহী। কে কী ভুল করল, কে কী বলল, কে কতটা ভালো বা খারাপ— এসব নিয়ে আমরা অনেক সময় ব্যস্ত থাকি। অথচ নিজের আমলনামা নিয়ে চিন্তা করার সময় বের করি না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যেদিন সম্পদ ও সন্তান কোনো কাজে আসবে না, তবে যে সুস্থ-পরিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে, সে ছাড়া’ (সুরা আশ-শুআরা, আয়াত : ৮৮-৮৯)। কেয়ামতের দিন অন্যের ভুল আমাদের মুক্তি দেবে না। 

অন্যের গুনাহ আমাদের নেক আমলের বিকল্প হবে না। তখন প্রত্যেক মানুষকে নিজের আমল ও নিজের অবস্থার হিসাব দিতে হবে। তাই ‘অমুক জাহান্নামি’, ‘তমুক ধ্বংসপ্রাপ্ত’ এমন মন্তব্য করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত— আমার নিজের ঈমান কেমন? আমার নামাজ কেমন? আমার উপার্জন হালাল কি না? আমার চরিত্র কেমন? আমি মানুষের হক আদায় করছি কি না? আমার অন্তরে অহংকার, হিংসা, রিয়া ও বিদ্বেষ আছে কি না? অন্যের দোষ খুঁজতে যে সময় ব্যয় করি, সেই সময়টুকু যদি নিজের সংশোধনে ব্যয় করি, তা হলে সেটিই আমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর।

লেখক : এমফিল গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   জান্নাত  জাহান্নাম  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: