কান্না শুকিয়ে যায় যেখানে লাশের অপেক্ষায়

আদিল সরকার

জাতীয়

বাবা রুহুল আমিন, সামনের লোহার বেড়ায় হেলান দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মর্গের দিকে। নির্ঘুম রাতের পর পুরো দিন গড়িয়েছে এখানেই।

2026-10-07T00:52:24+00:00
2026-10-07T00:52:24+00:00
 
  বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
কান্না শুকিয়ে যায় যেখানে লাশের অপেক্ষায়
আদিল সরকার
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫২ এএম 
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ। ছবি : সংগৃহীত
বাবা রুহুল আমিন, সামনের লোহার বেড়ায় হেলান দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মর্গের দিকে। নির্ঘুম রাতের পর পুরো দিন গড়িয়েছে এখানেই। বেলা সাড়ে ৩টা, চোখদুটি যেন ছোট হয়ে এসেছে। তারপরেও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আর সামনের বড় কক্ষটিই ঢাকা মেডিকেলের মর্গ। যেখানে কিশোরী মেয়ের নিথর দেহ পড়ে আছে সারা দিন ধরে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রথম মরদেহ হিসেবে ভেতরে যায় তার মেয়ের মৃতদেহ। কখন শেষ হবে পোস্টমর্টেম কখনই বা মেয়ের মরদেহ ফিরে পাবেন— সেসব ভেবে পাঁয়চারী করে বেড়াচ্ছেন আমিন। তার মতো মরদেহের অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন স্বজনদের আরও অনেকেই।

এদিকে অপেক্ষার জায়গাটিতে নেই বসার কোনো ব্যবস্থা। তার ওপরে ভেসে আসছে মরদেহের দুর্গন্ধ। তবু নেই কোনো হইচই। নিস্তব্ধতার সঙ্গে করুণ চাহনিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছেন স্বজনরা। মর্গের এপারে ঠিক সামনের জায়গাটি যেন স্বজনদের আরেক মর্গ। সময়ক্ষেপণ, দীর্ঘসূত্রতা ও ডাক্তারদের অনিয়মিত উপস্থিতি— সব মিলিয়ে যেন ভোগান্তির শেষ নেই। এখানে প্রিয়জনের নিথর দেহ গ্রহণে অপেক্ষার কষ্ট যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।

রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় হওয়া নৃশংসতা কিংবা আত্মহত্যা ও দুর্ঘটনার নানা ঘটনায় বড় সংখ্যক আহত ব্যক্তিকে পাঠানো হয় এই ঢাকা মেডিকেলে। ফলে হাসপাতালটিতে মৃতের সংখ্যা স্বভাবতই বেশি থাকে। আর সেই কারণে সেখানকার মর্গটিতে বেশ ভিড় থাকে মরদেহ নিয়ে আসা স্বজনদের। তবে মর্গ পর্যন্ত মরদেহ নিয়ে আসতেও শেষ নেই ভোগান্তির। থানা-পুলিশসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রেডি করতে অনেকটা বেগ পোহাতে হয় স্বজনদের। পরে কাগজপত্র ঠিক হলে মরদেহ আনা হয় মর্গে। সেখানেও দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয় তাদের।

মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বেশ কয়েকজন। পাশেই গাছের নিচে কিংবা দেয়াল ঘেঁষে বসে আছেন আরও কিছু ব্যক্তি। পরে কথা হয় সেখানে থাকা সোনালি আক্তারের সঙ্গে। তিনি এসেছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ থেকে। তার সঙ্গে রয়েছেন বোনের জামাই রুহুল আমিনসহ আরও একজন বয়স্ক নারী। রুহুল আমিনের মেয়ে আত্মহত্যা করে গত সোমবার হাসপাতালে মারা গেছেন। সোনালি আক্তার সময়ের আলোকে বলেন, পোস্টমর্টেমের জন্য সকালে মরদেহটা পুলিশ মর্গে দিয়ে গেছে। সেই সকাল থেকে বসে আছি। মরদেহটার কাজ কখন শেষ হবে সেটাও তারা বলছে না। কোনো কথাই বলে না তারা। জিজ্ঞেস করলে বলে দুপুরের পর ম্যাডাম (ডাক্তার) আসে নাই। এখানে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে বসে আছি। কতক্ষণ থাকা যায়? এ ছাড়া আজকে পাব কি না সেটাও বুঝতেছি না। কি অন্যায় আমাদের?  

এদিকে সম্প্রতি বরিশালে প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে ঝগড়ার পর স্বামীকে ভিডিও কলে রেখেই বিষপান করার ঘটনা ভাইরাল হয়। সেই স্ত্রীকে বরিশাল শেরে বাংলা হাসপাতালে কয়েক দিন রেখে পরে ঢামেকে আনা হলে গত সোমবার মৃত্যু হয় তার। পরে ওইদিন রাতে ইমারজেন্সির একটি হিমায়িত কক্ষে তার মরদেহ রাখা হয়। সকালে সেখান থেকে আনা হয় মর্গে। নিহতের বোনের ছেলে শাকিল প্রতিবেদককে জানান, সকাল থেকে খাড়াই (দাঁড়িয়ে) আছি। তার ওপরে আবার মরদেহের দুর্গন্ধ। কিন্তু কখন মরদেহটা হাতে পাব তাও বলতে পারছি না। গতকাল সারা রাত ঘুম হয়নি। তারা কি করে বুঝি না! এর আগে রবিন নামে এক যুবকের মরদেহ মর্গ থেকে এক দিন পর হাতে পায় স্বজনরা। ওই ঘটনায় স্বজনরা দাফনের জন্য কবর খুঁড়ে বসে থাকলেও সেদিন মরদেহ হাতে না পাওয়ায় রাত পর্যন্ত কবরে অপেক্ষা করে চলে যেতে হয়। পরদিন সন্ধ্যায় সেই মরদেহ হাতে পেয়ে রাতে দাফন করা হয়। যা নিয়ে প্রতিবেদকের কাছে গত ২৩ সেপ্টেম্বর ক্ষোভ জানান নিহতের দুলাভাই হুসাইন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মর্গে মরদেহ পোস্টমর্টেমের কাজ শুরু হয় বেলা ১২টায়। এর আগে কাগজপত্র নেওয়া হয়। পরে কাজ চলে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। এ সময়ের মাঝে আবার বিরতিসহ ডাক্তার না থাকলে কাজ বন্ধ রাখা হয়। 

পোস্টমর্টেমে দেরি হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সেখানকার ইনচার্জ (ডোম) রামু চন্দ্র দাস সময়ের আলোকে বলেন, ডাক্তার না এলে তো আমরা কিছু করতে পারি না। বিরতি শেষে ডাক্তার এলে বাইরে যারা আছে তারা মরদেহ পাবে। কখন ডাক্তার আসবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৪টার দিকে আসবেন। তবে অন্যান্য বিষয়ে জানতে চাইলে কর্তৃপক্ষের নিষেধ জানিয়ে কথা বলতে চাননি তিনি।  

মর্গে থাকা বাদল নামে ডোমের এক সহকারী বলেন, দিনে কমপক্ষে ৮-১০টা মরদেহ আসে। এ ছাড়া মিডফোর্ট হাসপাতালের মর্গে সমস্যা হওয়ায় সেখান থেকেও কিছু মরদেহ আমাদের এখানে আসছে। আমরা সবগুলোই কাজ শেষ করার চেষ্টা করি। তবে বিকাল ৫টার পর মরদেহ এলে আর কাজ করা হয় না, ফ্রিজে রেখে দেওয়া হয়। 

তিনি বলেন, পোস্টমর্টেমে ডাক্তারকে সহযোগিতা করার জন্য একজন কর্মকর্তাই রয়েছে এখানে। তবে তার সঙ্গে আমরাও কয়েকজন সহযোগিতা করি। মর্গে মরদেহ পোস্টমর্টেমে দেরি ও স্বজনদের ভোগান্তি নিয়ে জানতে হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. মমতাজ আরাকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কোনো রেসপন্স করেননি। এ ছাড়া তার মোবাইলফোনে বার্তা পাঠালেও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এদিন বিকাল ৪টায় মর্গে এই সহযোগী অধ্যাপকেরই আসার কথা জানিয়েছিলেন সেখানকার ডোম রামু চন্দ্র।


এদিকে যেকোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর (ইউডি) ক্ষেত্রে মর্গে আনা মরদেহের সুরতহাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও সেখানে গা-ছাড়াভাবে কাজ করতে দেখা যায়। এদিন বিকালে মর্গে এক আসামির মরদেহের সুরতহাল করতে দেখা যায়। এ সময় মর্গে কর্মরত এক সহকারীকে মরদেহ দেখে দেখে সুরতহালের তথ্য পুলিশকে দিতে দেখা যায়। সেখানে চোখ-নাক, পেট-পিঠ, হাত-পা ও পুরো শরীর দেখে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে বিস্তারিত বর্ণনা দেন তিনি। আর পুলিশের ওই কর্মকর্তাকে তা শুনে শুনে লিখতে দেখা যায়। এ ছাড়া নিহত ওই ব্যক্তির শারীরিক উচ্চতাও আন্দাজ করে ৫ ফিট ৫ ইঞ্জি লিখতে বলেন ওই সহকারী। তখন পুলিশ তাকে নির্ধারিত মাপের বিষয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেও আসলাম নামের ওই সহকারী বলেন, ‘আরে স্যার লিখেন। অনুমান করেই দিয়ে দেন।’ পরে ওই সহকারীর পরিচয় জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আমি মর্গের সহকারী হিসেবে আছি। সুরতহালে সহযোগিতা করি। তবে বিষয়টি নিয়ে জানতে সুরতহাল লিখা ওই পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে পরে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। 

ঢাকা মেডিকেলে দিনভর মরদেহ আসতে থাকে। মর্গের সামনে স্বজনরা কান্না শুকিয়ে যাওয়া চোখ নিয়ে অপেক্ষায়— কখন নিষ্প্রাণ প্রিয় মানুষের দেহ পাবেন, নিয়ে যাবেন বাড়ি, আর দাফন করে জানাবেন চিরবিদায়।  

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি
  বিষয়:   কান্না  লাশের অপেক্ষা  মর্গ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: