মাধ্যমিকেই ঝরে পড়ে অর্ধেক শিক্ষার্থী

এম মামুন হোসেন

জাতীয়

চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখ ৫৭ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০ জন।

2026-10-07T00:36:32+00:00
2026-10-07T00:37:12+00:00
 
  বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
মাধ্যমিকেই ঝরে পড়ে অর্ধেক শিক্ষার্থী
এম মামুন হোসেন
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৬ এএম  আপডেট: ০৭.১০.২০২৬ ১২:৩৭ এএম
মাধ্যমিকেই ঝরে ঝরে পড়ে অর্ধেক শিক্ষার্থী। ছবি : সংগৃহীত
চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখ ৫৭ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০ জন। তাদের মধ্যে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ৯ লাখ ৫৭ হাজার ১১১ জন। এই হিসাবে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬৯ জন পাস করেও আবেদন করেনি। দুই বছর আগে নবম শ্রেণিতে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেছিল ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ জন শিক্ষার্থী। নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাস পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫১১ জন। প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী এসএসসিতে অংশ নেয়নি। পরীক্ষায় অংশ নেয়নি, ফেল করা এবং পাস করেও কলেজে ভর্তি হয়নি সব মিলিয়ে মাধ্যমিকের গণ্ডিতেই ঝরে পড়েছে অর্ধেক শিক্ষার্থী। 

এর কারণ হিসেবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারিবারিক অসচ্ছলতা, বাল্যবিয়ে, শিশুশ্রম, পড়াশোনার প্রতি অনীহা-অসচেতনতা। অঞ্চলভেদে এর কারণেও আছে ভিন্নতা। এ ছাড়া গত এক বছরে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে পড়াশোনার খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

গত দেড় দশক আগেও দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ছিল ৫৫ শতাংশের বেশি। তবে দিন দিন কমেছে এই হার। বেড়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও। মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই দেওয়া, প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি প্রদান করা, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ানো, এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে ছাত্র-শিক্ষকের ব্যবধান কমানো এবং নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ; সব কারণে বিদ্যালয়ে বেড়েছে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, কমেছে ঝরে পড়ার হার।  

কিন্তু চলতি বছর এসএসসিতে এসে এই হিসাব-নিকাশে ধাক্কা খেয়েছে। এডুকেশন ওয়াচের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতায় ভোগা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাধ্যমিকেই ঝরে পড়ছে ৫৯.৮ শতাংশ। এ ছাড়া পড়াশোনায় অনীহা, শিশুশ্রম ও পাবিারিক কাজে যুক্ত হওয়ায় অনেকে বন্ধ করেন পড়াশোনা। ঝরে পড়ার এই কারণের তালিকায় আছে ভাষাগত সমস্যা ও স্কুলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা। গবেষণা বলছে, ২০২৩ সালের প্রথম ৬ মাসে প্রাথমিকের একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনার জন্য পরিবারের খরচ বেড়েছে, ২৫ শতাংশ আর মাধ্যমিকে ৫১ শতাংশ। শিক্ষাবিদরা বলছেন, উপবৃত্তিতে টাকার পরিমাণ বাড়ানোসহ স্কুল ফিডিং কর্মসূচি নিয়মিত করতে হবে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে ২৬ লাখের বেশি। বিপরীতে সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। ফলে আসনের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক কম। পাস করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮৪ শতাংশ একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে। আর প্রায় ১৬ শতাংশ পাস করা শিক্ষার্থী আবেদন করেনি। এমন অনেক কলেজ রয়েছে যেখানে আবেদন পড়েছে, কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। আবার ১২টি কলেজে কোনো আবেদনই পড়েনি।

একাদশে দ্বিতীয় ধাপের ফলাফলেও জিপিএ-৫ পেয়েও ৩২১ শিক্ষার্থী কোনো কলেজে নির্বাচিত হয়নি। একই সঙ্গে মোট ৫ হাজার ১২৯ জন আবেদনকারী কোনো কলেজে বরাদ্দ পায়নি। অর্থাৎ মোট আবেদনকারীর তুলনায় কলেজ না পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম। প্রকাশিত গ্রাফিক তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, মোট বরাদ্দের প্রায় ৯৯ শতাংশই সম্পন্ন হয়েছে, বিপরীতে বরাদ্দ না পাওয়া শিক্ষার্থী প্রায় ১ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ পেয়েও কলেজ না পাওয়া ৩২১ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। ভালো ফল করেও পছন্দের কলেজের তালিকা, আসনসংখ্যা এবং প্রতিযোগিতার কারণে কোনো কলেজে বরাদ্দ না পাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।

১২টি কলেজে কোনো আবেদন নেই : 

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। দ্বিতীয় ধাপে ১২টি কলেজে কোনো আবেদনই পড়েনি। পাশাপাশি ৪১৬টি কলেজে আবেদন করলেও কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এতে বোঝা যাচ্ছে মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সারা দেশে সয়লাব হয়ে গেছে।

ঢাকা বোর্ডে নির্বাচিত সবচেয়ে বেশি : 

বোর্ডভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে নির্বাচিত হয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজার ৭৪৩ জন। এ বোর্ডে আবেদনকারী ছিল ৩ লাখ ৫ হাজার ৫৮৭ জন। ফলে আবেদনকারী ও নির্বাচিতের মধ্যে পার্থক্য ৩৩ হাজার ৮৪৪ জন। রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৪১ জন আবেদনকারীর মধ্যে নির্বাচিত হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৮৬ জন। কুমিল্লা বোর্ডে ১ লাখ ১ হাজার ৫৫৪ জন আবেদনকারীর মধ্যে নির্বাচিত হয়েছে ৯১ হাজার ৯৮৭ জন। দিনাজপুর বোর্ডে ১ লাখ ৭ হাজার ৪২১ জন আবেদনকারীর মধ্যে নির্বাচিত হয়েছে ৯৯ হাজার ৯৫০ জন। যশোরে ৯৩ হাজার ৪৩৭ জন আবেদনকারীর মধ্যে নির্বাচিত হয়েছে ৮৮ হাজার ৩০৭ জন। মাদরাসা বোর্ডে ১ লাখ ২ হাজার ৪৯৯ জন আবেদনকারীর মধ্যে নির্বাচিত হয়েছে ৯৯ হাজার ৬৩১ জন। সব মিলিয়ে ১০টি শিক্ষা বোর্ড ও মাদরাসা বোর্ড মিলিয়ে ২৬ লাখ ৬ হাজার ১৪৮টি আসনের বিপরীতে আবেদনকারী ছিল ১০ লাখ ৩ হাজার ২৮৮ জন নির্বাচিত হয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক আসন এখনও খালি রয়েছে।

মানবিক বিভাগে আবেদন বেশি : 

বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ভিন্নতা দেখা গেছে। মানবিক বিভাগে আসন রয়েছে ৯ লাখ ৯৭ হাজার ৪২৪টি। এর বিপরীতে আবেদন করেছে ৫ লাখ ৯২ হাজার ১০৫ জন এবং নির্বাচিত হয়েছে ৫ লাখ ২৮ হাজার ৭১৩ জন। বিজ্ঞান বিভাগে ৬ লাখ ২৭ হাজার ১০২টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৪২ জন। নির্বাচিত হয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৯৩ জন। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৬ লাখ ৪৮ হাজার ৯১৮টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬৭ জন। নির্বাচিত হয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ২০৫ জন। অন্যদিকে সাধারণ মাদরাসা বিভাগে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫৯টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ৯৮ হাজার ৪৬২ জন এবং নির্বাচিত হয়েছে ৯৩ হাজার ৫১৪ জন।

একদিকে আসন খালি, অন্যদিকে কলেজ না পাওয়া শিক্ষার্থী : দেশের কলেজগুলোতে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকলেও কিছু শিক্ষার্থী— এমনকি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও পছন্দের তালিকা অনুযায়ী কলেজে বরাদ্দ পাচ্ছে না। ভর্তি ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের পছন্দের কেন্দ্রীভবন এবং কলেজগুলোর প্রতি অসম চাহিদা নতুন করে সামনে এসেছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন কলেজে খালি আসন থাকা এবং কিছু শিক্ষার্থীর কলেজ না পাওয়ার বিষয়টি ভর্তি ব্যবস্থাপনায় আরও ভারসাম্যপূর্ণ পছন্দ নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরছে।

গত বছর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর দেখা গিয়েছিল, ফরম পূরণ করার পরও পরীক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। তাদের তথ্য যাচাই করে তখন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, বাল্যবিয়ে হওয়ার কারণে মূলত তারা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। এই যদি হয় বাস্তবতা, তবে শিক্ষা নিয়ে কথা বলার আগে দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ এসএসসি পরীক্ষা শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর বা ধাপ। এই ধাপ অতিক্রম করতে না পারার ব্যর্থতা এককভাবে মোটেও শিক্ষার্থীর নয়।


শিক্ষা যে ধীরে ধীরে ব্যয়বহুল পণ্যে পরিণত হচ্ছে, সেটি আমরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছি। স্কুল-কলেজের প্রতি বছরের ভর্তি ফি ও বেতন পরিশোধ করার সক্ষমতাই থাকে না অসংখ্য পরিবারের। এর সঙ্গে আছে বই-কলম-খাতা ও শিক্ষাসংক্রান্ত অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়। তা ছাড়া কোচিং ও গাইড ছাড়া পড়াশোনা করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে; ফলে এই খাতেও অভিভাবকদের টাকা গুনতে হয়। এক পরিবারের একাধিক সন্তান থাকলে সে ক্ষেত্রে খরচ দ্বিগুণ থেকে কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে শিক্ষার খরচ চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বাল্যবিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে রয়েছে। সামাজিকভাবে বাল্যবিয়ের বিপরীতে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া গেছে, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন পুরোপুরি দেখা যায় না। আর্থিক অসচ্ছলতা, সামাজিক নিরাপত্তাঘাটতি এগুলোও বাল্যবিয়েকে উসকে দিচ্ছে। ফলে শিক্ষার প্রকৃত বিস্তার ঘটাতে চাইলে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নকে এর সঙ্গে এক করেই দেখতে হবে। বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে শুধু আইন প্রয়োগ করে হবে না, মানুষের মনোগত পরিবর্তন নিয়েও কাজ করতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এর সুফল পাওয়া যাবে না।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   মাধ্যমিক  শিক্ষার্থী  ঝরে পড়া  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: