তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর আগেই দাবি করা যাবে দেনমোহর : হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক

আইন-আদালত

দেনমোহর পেতে স্ত্রীকে তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। নিকাহনামায় দেনমোহর নির্ধারিত থাকলে আর্থিক অসচ্ছলতার অজুহাতে স্বামী

2026-10-07T11:24:52+00:00
2026-10-07T12:04:37+00:00
 
  বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
আইন-আদালত
তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর আগেই দাবি করা যাবে দেনমোহর : হাইকোর্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২৪ এএম  আপডেট: ০৭.১০.২০২৬ ১২:০৪ পিএম
হাইকোর্ট। ছবি : সংগৃহীত
দেনমোহর পেতে স্ত্রীকে তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। নিকাহনামায় দেনমোহর নির্ধারিত থাকলে আর্থিক অসচ্ছলতার অজুহাতে স্বামী তা পরিশোধের দায় এড়াতে পারবেন না। এমনকি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দেনমোহর দিতে গড়িমসি করলে স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারেন বিচারিক আদালত। ‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’—দেওয়ানি রিভিশন মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ এসেছে।

বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৩ সেপ্টেম্বর ওই রায় দেন। ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দ্রুত দেনমোহর আদায়ের জন্য কোনো স্ত্রীকে যদি আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়, তাহলে ঘটনা বিবেচনা করে দেনমোহর পরিশোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও স্বামী যদি তা দিতে বিলম্ব করেন, সে ক্ষেত্রে বিচারিক আদালত স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন।

আদালত এও বলেছেন, স্ত্রী স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে ও কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাব ছাড়া দেনমোহরের পুরো বা আংশিক অংশ মওকুফ করলে, সেটি আইনিভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু জোরপূর্বক, প্রতারণা বা অন্যায় প্রভাবের মাধ্যমে নেওয়া কোনো মওকুফ বৈধ বলে গণ্য হবে না।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর ২২ লাখ টাকা দেনমোহরে তাদের বিয়ে হয়। তাদের একটি মেয়ে রয়েছে।

স্ত্রীর অভিযোগ- বিয়ের পর স্বামী তার কাছে ২০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন এবং একপর্যায়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ২০১৭ সালের পর থেকে তার স্বামী মেয়ের ভরণপোষণও যথাযথভাবে দেননি। 


এরপর স্ত্রী দেনমোহর, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং মেয়ের ভরণপোষণের বকেয়া আদায়ের জন্য চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। স্বামী আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় ২০২২ সালের ৫ মে একতরফা ডিক্রি দেওয়া হয়।

ওই ডিক্রিতে স্বামীকে ১৮ লাখ টাকা দেনমোহর, ইদ্দতকালীন তিন মাসের ভরণপোষণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং মেয়ের অতীতের ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি মেয়ের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতি বছর এ অর্থের ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধির কথাও রায়ে উল্লেখ রয়েছে।

ডিক্রি কার্যকরের জন্য স্ত্রী ওই বছরই চট্টগ্রামের আদালতে মামলা করেন। পরে স্বামী মামলার খবর পেয়ে একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন করেন এবং ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে ওই এক্সিকিউশন মামলায় জামিন নেন। কিন্তু তার আবেদন নিষ্পত্তির আগেই তিনি একটি আপিল দায়ের করেন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজের পঞ্চম আদালত ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট ওই আপিল খারিজ করে পারিবারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর তিনি হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন।

হাইকোর্টে স্বামীর পক্ষ থেকে বলা হয়, নিম্ন আদালতগুলো সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি এবং তিনি মামলার সমনও পাননি। তার আইনজীবী আরও জানান, ইতোমধ্যে তিনি ডিক্রির ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। ব্যবসা হারিয়ে আর্থিকভাবে সংকটে পড়ায় বাকি টাকা একসঙ্গে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তাকে মাসিক কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার আবেদন করা হয়।


অন্যদিকে স্ত্রীর পক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেন, নিম্ন আদালতই সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। স্বামী মূলত পুনরায় একই বিষয় তুলে ধরে মামলাটি দীর্ঘায়িত করতে চাইছেন। তার আর্থিক অক্ষমতার দাবিও বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং স্ত্রী ও সন্তানের আইনগত অধিকার বাস্তবায়নে বিলম্ব করা উচিত নয় বলে আদালতে দাবি করা হয়।

বিভিন্ন সুরার আয়াত উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, এসব আয়াত পবিত্র কোরআনের আলোকে একটি রূপরেখা দেয়। এতে প্রতীয়মান হয়, মোহর (দেনমোহর) স্ত্রীর একটি আর্থিক ও স্বতন্ত্র অধিকার। এটি বিয়ে থেকে তৈরি হওয়া একটি বাধ্যবাধকতা। স্বামী তা ফেরত দাবি করতে পারেন না। তবে, স্ত্রীর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত মওকুফ গ্রহণযোগ্য। আইনসঙ্গত বিয়ের ক্ষেত্রে মোহর বিলম্বিত করার কোনো সুযোগ নেই।

আদালত বলেছেন, স্ত্রী দাবি করলে বিলম্বিত দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে। বিয়ের চুক্তি ও মুসলিম আইন অনুসারে, অবিলম্বে বা চাহিদা মোতাবেক সেই দেনমোহর পরিশোধ করতে হবে।

হাইকোর্ট রায়ে বলেন, নিম্ন আদালতগুলোর নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্ত্রী বিয়ে, সন্তান জন্ম এবং বিবাহবিচ্ছেদের বিষয়টি সাক্ষ্য ও নথিপত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। আদালতগুলো একমতভাবে দেনমোহর ও ভরণপোষণের অধিকার স্বীকার করেছে।

রায়ে দেনমোহর বিষয়ে ইসলামী শরিয়াহর বিধানও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়। আদালত কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে বলেন, দেনমোহর কোনো সাধারণ বা ঐচ্ছিক উপহার নয়; এটি স্ত্রীর একটি আর্থিক অধিকার এবং বিয়ের মাধ্যমে স্বামীর ওপর সৃষ্টি হওয়া দায়। স্ত্রী স্বেচ্ছায় কোনো অংশ ছেড়ে না দিলে স্বামী তা ফেরত নেওয়ার অধিকার রাখেন না।

আদালত আরও বলেন, মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯-এর নিকাহনামায় দেনমোহর, তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত দেনমোহর এবং পরিশোধিত অর্থের জন্য পৃথক ঘর রয়েছে। তবে স্ত্রী সম্মতি না দিলে শুধু নিকাহনামায় বিলম্বিত দেনমোহর লেখা থাকার কারণে সেটিকে অনির্দিষ্টকাল পরিশোধ না করার সুযোগ নেই। স্ত্রী দাবি করলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তা তাৎক্ষণিক দেনমোহর হিসেবে পরিশোধযোগ্য হতে পারে।


বিচারপতি আবদুর রহমান রায়ে বলেন, ‘বিয়ের সময় নির্ধারিত দেনমোহর স্বামীর কাছে স্ত্রীর পাওনা ঋণের মতো। স্ত্রীকে দেনমোহর আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে হলে এবং স্বামীর অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা আটকে রাখলে, মামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় ট্রায়াল কোর্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করতে পারেন।’

আদালত স্পষ্ট করে বলেন, হাইকোর্ট বা কোনো আদালত কোনো স্ত্রীর দেনমোহর মওকুফ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। তবে স্ত্রী নিজ ইচ্ছায়, কোনো চাপ বা প্রতারণা ছাড়া দেনমোহরের পুরো বা আংশিক অংশ মওকুফ করতে পারেন। এমন মওকুফের দাবি করলে সেটি যে স্বাধীন ও স্বেচ্ছাপ্রসূত ছিল, তার প্রমাণ থাকতে হবে।

মামলার ভরণপোষণের অংশেও হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। আদালত বলেন, স্কুলপড়ুয়া একটি শিশুর খাবার, বাসস্থান, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন বিবেচনায় ভরণপোষণ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ব্যয় এবং উৎসবসহ শিশুর প্রয়োজন বিবেচনায় মাসিক ভরণপোষণের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট স্বামীর রিভিশন আবেদন খারিজ করে দেন এবং নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রিতে হস্তক্ষেপের কোনো আইনগত বা এখতিয়ারগত ত্রুটি পাননি। ফলে ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকার ডিক্রি বহাল থাকে।

হাইকোর্টে স্ত্রীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তিনি বলেন, ‘দেনমোহর কমানোর এখতিয়ার হাইকোর্টেরও নেই বলে রায়ে বলা হয়েছে। দেনমোহর দাবি করে মামলা করার আগে কিন্তু বিয়ে হয়। বিয়ের সময় একটি অর্থ দেনমোহর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। দেনমোহর দাবি করে মামলা করতে গিয়ে নারীর আরও কয়েক গুণ টাকা খরচ হয়ে যায়। দেনমোহর পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্বামী যদি হয়রানি করে, সে ক্ষেত্রে বিচারিক আদালত স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন। এখন যদি কোনো নারীর ক্ষেত্রে দেনমোহর হয় পাঁচ লাখ টাকা, আর যদি তাকে পাঁচ বছর হয়রানি করা হয়, সে ক্ষেত্রে আদালত চাইলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ লাখ টাকাও নির্ধারণ করতে পারেন। দেনমোহরের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি নতুন। রায়ের ফলে দেনমোহর নিয়ে হয়রানি করলে নারীর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে মামলা করার পরিবর্তে মীমাংসার দিকে যাবে।’

আইনজীবীদের বক্তব্য, ঘটনা ও ইসলামি আইনের নীতিমালার ভিত্তিতে এই আদালতের (হাইকোর্ট) দেনমোহরের কোনো অংশ মওকুফ বা কমিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে রায়ে। এতে বলা হয়, তবে আইনে স্বীকৃত যে একজন স্ত্রী তার স্বামীর অনুকূলে স্বেচ্ছায় তার মোহরের সম্পূর্ণ বা আংশিক অংশ ত্যাগ বা মওকুফ করতে পারেন। এ ধরনের ত্যাগ বা মওকুফের ওপর নির্ভর করতে হলে প্রমাণ থাকতে হবে যে তা ছিল সচেতন, দ্ব্যর্থহীন ও স্বাধীনভাবে। জবরদস্তি, অযাচিত প্রভাব, প্রতারণা অথবা স্বাধীন সম্মতিকে ক্ষুণ্ন করে—এমন অন্য কোনো উপায়ে আদায় করা মওকুফকে বৈধ মওকুফ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   দেনমোহর  হাইকোর্ট  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আইন-আদালত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: