তিন বছরের যুদ্ধে কীভাবে বদলে গেছে গাজা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর তিন বছর পর গাজা এখন আগের চেহারা হারিয়েছে। দীর্ঘদিনের হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞে ঘরবাড়ি, রাস্তা, হাসপাতাল, স্কুল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ

2026-10-07T19:53:44+00:00
2026-10-07T19:53:57+00:00
 
  বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
তিন বছরের যুদ্ধে কীভাবে বদলে গেছে গাজা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৫৩ পিএম  আপডেট: ০৭.১০.২০২৬ ৭:৫৩ পিএম
গাজা সিটিতে ইসরায়েলি সামরিক হামলায় ধ্বংস হওয়া ভবনগুলোর মাঝ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। ছবি : এপি
ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর তিন বছর পর গাজা এখন আগের চেহারা হারিয়েছে। দীর্ঘদিনের হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞে ঘরবাড়ি, রাস্তা, হাসপাতাল, স্কুল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বদলে গেছে প্রায় ২০ লাখ মানুষের জীবনযাপন, কাজ, পড়াশোনা ও বেঁচে থাকার ধরন।  

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এখন পর্যন্ত ৭৪,২৪৫ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও গাজায় সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। যুদ্ধবিরতির পরও আরও ১,৪৬২ জন নিহত হয়েছেন বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। 

ঘর নেই, স্বাভাবিক জীবনও নেই

যুদ্ধের কারণে লাখো মানুষ বারবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাবে, সেপ্টেম্বরেও গাজার ৯৪ শতাংশ মানুষের জরুরি আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দরকার ছিল। প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছিল।

পানি ও বিদ্যুতের সংকটও ভয়াবহ। আগস্টের শুরুতে জরিপ করা পরিবারের ৯১ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র পানি সংকটে ছিল। গাজায় কার্যকর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকায় হাসপাতাল ও সাধারণ মানুষকে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

রাস্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া, ফোন করা কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার করাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দৈনন্দিন জীবন এখন অনেকটাই পানি সংগ্রহ, খাবার রান্না, ফোন চার্জ দেওয়া ও প্রয়োজনীয় সেবা খোঁজার মতো মৌলিক বিষয় ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে।

ধ্বংস অর্থনীতি, নেই কাজ

গাজার অর্থনীতিতেও যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্ব বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশে।

২০২৫ সালে মাথাপিছু জিডিপি কমে মাত্র ২১২ ডলারে দাঁড়ায়, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৮৩ শতাংশ কম। কৃষি ও শিল্প উৎপাদনও আগের তুলনায় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। 

কাজ ও আয় হারিয়ে অনেক পরিবার এখন মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। নগদ অর্থের সংকট থাকায় কেউ কেউ ডিজিটাল পেমেন্ট ও ই-ওয়ালেট ব্যবহার করছেন। 

প্রায় তিন বছর ধরে স্কুলের বাইরে শিশুরা

যুদ্ধ গাজার শিক্ষা ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু প্রায় টানা তিন বছর শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করতে পারেনি। প্রায় ২ লাখ শিশু কোনো শিক্ষার সুযোগই পাচ্ছে না। 

অনেক শিশু এখন স্কুলের বদলে তাঁবু বা অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করছে। দীর্ঘদিন পড়াশোনা বন্ধ থাকায় শিশুদের মৌলিক দক্ষতা ও শিক্ষাজীবন নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ভেঙে পড়ার পথে স্বাস্থ্যব্যবস্থা 

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবস্থাও অত্যন্ত সংকটজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লুউএইচও) হিসাবে, গাজার ৩৬টি হাসপাতালই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১৯টি হাসপাতাল চালু আছে, তাও কোনোটিই পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। 

ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপকরণ ও জ্বালানির সংকটে ক্যানসার, ডায়ালাইসিস ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় ১২,৪০০ রোগীকে চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আরও কয়েক হাজার মানুষের এমন চিকিৎসা প্রয়োজন, যা গাজার ভেতরে পাওয়া যাচ্ছে না।  

অপর্যাপ্ত আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের অভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেড়েছে।


আরও ছোট হয়ে আসছে বসবাসের জায়গা

যুদ্ধ গাজার ভৌগোলিক চিত্রও বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে ফিলিস্তিনিরা ক্রমেই ছোট একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছেন।  

সেপ্টেম্বরে ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের হিসাবে, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। ফলে ২০ লাখের বেশি মানুষ গাজার ৩০ শতাংশেরও কম এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছেন।

রাফাহ এর বড় উদাহরণ। যুদ্ধের সময় শহরটি লাখো বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরুর পর ৮ লাখের বেশি মানুষ রাফাহ থেকে বাস্তুচ্যুত হন বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে। বর্তমানে রাফাহর বড় অংশ ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে থাকায় সেখান থেকে বাস্তুচ্যুত অনেক মানুষ নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।  

দুর্বল হয়েছে প্রশাসন ও নিরাপত্তা

যুদ্ধের আগে ২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করছিল হামাস। কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে বেসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। 

জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পুলিশের ওপর অন্তত ১২টি হামলায় ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫ জন ছিলেন পুলিশ সদস্য। 

পুলিশ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় গাজায় নিরাপত্তাহীনতা, অপহরণ, সম্পত্তিতে হামলা এবং ত্রাণ লুটের মতো ঘটনাও বেড়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে।

তিন বছর পর গাজার বাস্তবতা

তিন বছরের যুদ্ধ গাজার মানুষের কাছ থেকে শুধু ঘরবাড়ি বা অবকাঠামোই কেড়ে নেয়নি; বদলে দিয়েছে তাদের জীবনযাপন, অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রতিদিনের জীবন এখন স্বাভাবিকতার বদলে টিকে থাকার সংগ্রাম।

সূত্র : আল জাজিরা


সময়ের আলো/ইউএমএইচ


  বিষয়:   গাজা  ইসরায়েল  হামাস  যুদ্ধ  ফিলিস্তিনি 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: