ফের আগামী ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে দেশে চালু হচ্ছে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (এনইআইআর) বা জাতীয় সরঞ্জাম শনাক্তকরণ রেজিস্টার।
মোবাইল হ্যান্ডসেটের অবৈধ আমদানি ও ব্যবহার রোধ করা, নকল বা ক্লোন হ্যান্ডসেট উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ প্রতিহত, চুরি যাওয়া হ্যান্ডসেটের ব্যবহার রোধ, অবৈধ হ্যান্ডসেট ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধ এবং সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এনইআইআর আবার চালু করা হচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) কমিশন সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সরকারের অনুমোদনের পর এনইআইআর চালুর সার্বিক কার্যক্রম শুরু হবে।
বিটিআরসির তথ্যনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এনইআইআর সিস্টেমে প্রায় ৭৭.০৬ কোটি ‘আইএমইআই’ (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেনন্টিটি) নম্বরের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪১ কোটি ১৮ লাখ আইএমইআই গ্রে-লিস্টভুক্ত, অর্থাৎ অনুমোদনহীন তালিকায় রয়েছে।
তবে আইএমইআইর সংখ্যা মোবাইল হ্যান্ডসেটের প্রকৃত সংখ্যার সমতুল্য নয়। কারণ একটি হ্যান্ডসেটে একাধিক আইএমইআই থাকতে পারে এবং ক্লোন বা নকল আইএমইআই ব্যবহার করে একাধিক হ্যান্ডসেট বাজারজাত করা সম্ভব। ফলে শুধু আইএমইআইর সংখ্যা দিয়ে দেশে ব্যবহৃত প্রকৃত হ্যান্ডসেটের সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
পূর্ণাঙ্গভাবে এনইআইআর চালুর বিষয়ে বিভিন্ন দফতরের সুপারিশ : এনইআইআরের মূল পরিকল্পনা ও ডিজাইন অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে সুপারিশ করেছে বিভিন্ন দফতর ও সংস্থা।
অর্থনীতি ও জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এনইআইআর সিস্টেমটি পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে কমিশনের কাছে গত ৯ জুন চিঠি দিয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই। এরপর গত ২ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মোবাইল আইএমইআই ও সিম রেজিস্ট্রেশনের দুর্বলতা এবং ‘মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের’(এমএফএস) অপব্যবহারের কারণ উদঘাটন ও করণীয় নির্ধারণ বিষয়ক সভায়ও এনইআইআর সিস্টেম চালুর বিষয়টি প্রস্তাব করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ওই সভায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় আগামী ১ জানুয়ারির মধ্যে এনইআইআর সিস্টেম চালুর বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট কমিশন বরাবর একটি চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চিঠিতে বলা হয়, অবৈধভাবে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত হ্যান্ডসেট শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশের বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
দুই ধাপে এনইআইআর চালুর প্রস্তাব : মানসম্মত মোবাইল হ্যান্ডসেট নিশ্চিতকরণ, সরকারের রাজস্ব সুরক্ষা, অবৈধ হ্যান্ডসেটের ব্যবহার প্রতিরোধ এবং জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এনইআইআর সিস্টেমটি দুই ধাপে চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
প্রথম ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি ব্যতীত মূল পরিকল্পনা ও ডিজাইন অনুযায়ী অন্যান্য ফিচারসহ এনইআইআর সিস্টেম চালু করা। এর মাধ্যমে অবৈধভাবে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত হ্যান্ডসেট শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মোবাইল হ্যান্ডসেটের ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
তবে প্রথম ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি চালু না থাকায় প্রকৃত ও সবশেষ মালিকের মাধ্যমে হ্যান্ডসেটের মালিকানা নিশ্চিতকরণ এবং ক্লোন আইএমইআইভিত্তিক হ্যান্ডসেট ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না।
দ্বিতীয় ধাপে উপযুক্ত প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় জনসচেতনতা কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর ডি-রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি চালু করা। এর মাধ্যমে হ্যান্ডসেটের প্রকৃত ও সবশেষ মালিকের তথ্য সংরক্ষণ ও মালিকানাভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ক্লোন বা চুরি যাওয়া হ্যান্ডসেটের ব্যবহার প্রতিরোধ আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কে সচল সব হ্যান্ডসেটের আইএমইআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনইআইআর সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশের সব মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকের কাছে বিদ্যমান ও অবিক্রীত হ্যান্ডসেটগুলোর আইএমইআই এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য এনইআইআর সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এর ফলে বিদ্যমান বৈধ হ্যান্ডসেটগুলোর ব্যবহার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে বাজারে নতুন করে অবৈধ হ্যান্ডসেট প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
প্রথম ধাপে ডি-রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি ব্যতীত মূল পরিকল্পনা ও ডিজাইন অনুযায়ী অন্যান্য ফিচারসহ এনইআইআর সিস্টেমটি আগামী ১ জানুয়ারি থেকে চালু করা। দ্বিতীয় ধাপে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, জনসচেতনতা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পন্ন করে উপযুক্ত সময়ে ডি-রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি চালু করা।
এ বিষয়ে বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের একজন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা জানান, দুই ধাপে এনইআইআর সিস্টেম চালুর বিষয়ে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণের লক্ষ্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অনুমোদনের প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ গ্রহণ করা হবে।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়ব ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে দেশব্যাপী ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা কার্যকর করার ঘোষণা দেন। তবে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তা পিছিয়ে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি চালুর নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।
মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি) এই ব্যবস্থা চালুর বিরোধিতা করে দাবি করে, আমদানিকৃত হ্যান্ডসেটের ওপর উচ্চমাত্রার কর আরোপের ফলে ফোনের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং খুচরা বিক্রেতারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ কর্মসূচির বাস্তবায়ন রুখতে আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি কার্যালয়সহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন ব্যবসায়ীরা।
অবশেষে ২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে এনইআইআর ব্যবস্থা চালুর পর ক্ষুব্ধ হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীরা আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিটিআরসি ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এই ঘটনা এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটের গভীরতাকে আরও প্রকট করে তোলে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে