স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) জ্যেষ্ঠতার তালিকা নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী শহীদুজ্জামান খানের জ্যেষ্ঠতা কয়েক দফায় অস্বাভাবিকভাবে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে ১৫৯ জন কর্মকর্তাকে পেছনে ফেলে তাকে সামনের সারিতে আনা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের। এ ছাড়া ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জন্মস্থান পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে।
এলজিইডির সর্বশেষ জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রকাশ করা হয় গত ৩১ আগস্ট। এতে শহীদুজ্জামান খানের অবস্থান ৪০ নম্বরে। অথচ ২০২৪ সালের খসড়া তালিকায় তিনি ছিলেন ১৯৯ নম্বরে। পরে চলতি বছরের এপ্রিলের খসড়ায় তাকে ৬৮ নম্বরে আনা হয়। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে তার অবস্থান ১৫৯ ধাপ এগিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের অভিযোগ, শুধু জ্যেষ্ঠতার অবস্থানই নয়, শহীদুজ্জামানের প্রকল্পে যোগদানের সালও পরিবর্তন করা হয়েছে। নথিপত্র অনুযায়ী তিনি ২০০৪ সালে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে যোগ দেন। কিন্তু সর্বশেষ জ্যেষ্ঠতার তালিকায় প্রকল্পে যোগদানের সময় ১৯৯৭ সাল দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে তিনি সাত বছর এগিয়ে গিয়ে জ্যেষ্ঠতার সুবিধা পেয়েছেন বলে দাবি কর্মকর্তাদের।
১৯৯ থেকে ৪০ নম্বরে
এলজিইডি সূত্র জানায়, এলজিইডিতে সরাসরি পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত প্রকৌশলীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব জিইয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। দুপক্ষই আদালতে যাওয়ার কারণে জ্যেষ্ঠতার তালিকা নির্ধারণ ব্যাহত হয়েছে এবং ২০০৮ সালের পর আর কোনো চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন পায়নি। দীর্ঘদিনের পুরোনো তালিকার পর ২০১৫ ও ২০২৪ সালে দুটি খসড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকা করা হয়। তবে কোনোটিই চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত কয়েক দফা সংশোধনের পর ৩১ আগস্ট নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয়।
২০২৪ সালের খসড়ায় শহীদুজ্জামানের অবস্থান ছিল ১৯৯ নম্বরে। এপ্রিলের খসড়ায় তা হয় ৬৮ নম্বর। সর্বশেষ তালিকায় আরও ২৮ ধাপ এগিয়ে তাকে ৪০ নম্বরে রাখা হয়েছে। । প্রকৌশলীদের অভিযোগ, এ পরিবর্তনের কারণে ১৯৯৭ সালের পিএসসি ব্যাচের আবদুস সাত্তারসহ অন্তত ২৯ জন কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠতার বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তাদের মতে, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় এ ধরনের পরিবর্তন ভবিষ্যৎ পদোন্নতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে প্রধান প্রকৌশলী পদে কে আগে বিবেচিত হবেন, তা নির্ধারণে জ্যেষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রকৌশলীরা স্থানীয় সরকার বিভাগের শুনানিতে বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছেও লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি না করেই সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
যোগদানের সাল নিয়ে প্রশ্ন
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন, ২০০৪ সালে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে যোগ দেওয়া একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রকল্পে যোগদানের সাল ১৯৯৭ কীভাবে দেখানো হলো। তাদের দাবি, এই তথ্যের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হলে একই সময়ে চাকরিতে থাকা অন্য কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
আলোচিত কর্মকর্তা শহীদুজ্জামান খান ফরিদপুরে কর্মরত থাকাকালে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্য গড়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে যে, সচিব তাকে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান প্রকৌশলী করতে চাচ্ছেন। প্রকাশিত খসড়াটি চূড়ান্ত হলে তিনি আগামী বছর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং ২০২৮ সালে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাবেন।
শহীদুজ্জামান খান অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালে তিনি উপজেলা প্রকৌশলী হয়েছিলেন কি না, তা যাচাই করলেই তার জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি পরিষ্কার হবে। তার বিরুদ্ধে আনা অন্য অভিযোগগুলোও সত্য নয় বলে তিনি দাবি করেন।
শহীদুজ্জামানের জন্মস্থান নিয়েও তথ্য পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পে যোগদানের সময় তার জন্মস্থান গোপালগঞ্জ দেখানো হলেও পরে তা খুলনা করা হয়েছে। এ পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ
শহীদুজ্জামানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও উঠেছে। ২০০৯ সালে ফরিদপুর প্রেস ক্লাবে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাজেদা চৌধুরীর উপস্থিতিতে সংগঠনটিতে তার যোগদানের অভিযোগ সামনে এসেছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামান স্বাক্ষরিত চিঠিতে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ কমিটির ৫৩ নম্বর সদস্য হিসেবে তার নাম রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে খুলনা মহানগর বিএনপির প্রত্যয়ন পত্রে তাকে জাতীয়তাবাদী আদর্শের সৈনিক হিসেবে দাবি করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শহীদুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে আমাকে পদবঞ্চিত করা হয়েছে। আমি তো কখনো ঢাকায় চাকরি করিনি, তা হলে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু পরিষদে যোগ দেব কীভাবে, ৩১ বছর ঢাকার বাইরে চাকরি করেছি। চাকরিতে ঢুকেছি ১৯৯৫ সালে। ১৯৯৭ সাল থেকে আমি উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার রাজস্ব খাতে। তা হলে আমি ২০০৪ সালের বানানো হচ্ছে কেন জোর করে। আওয়ামী লীগ সরকারে এসে ২০৮-০৯ সালে আমার জ্যেষ্ঠতা কমিয়ে দেয়। আমার গায়ে সাইন বোর্ড ( বিএনপি তকমা) থাকায় ১৮ বছর আমার চাকরি রয়েছে এটাই তো বেশি। এখন বিএনপি এলে সুবিচার পাব না?
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন গণমাধ্যমে বলেন, জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরির সময় বিভিন্ন দিক যাচাই করা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তালিকা তাদের কাছে নেই। তবে প্রমাণিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে