রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হওয়ার দুই দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ। এমনকি হামলার শিকার সাংবাদিকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হামলার ভিডিও ফুটেজ থাকলেও মামলায় কারও নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
আহত সাংবাদিকরা হলেন—দ্য ডেইলি স্টারের রাবি প্রতিনিধি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নূর আহসান মৃদুল, আগামীর সময়ের রাবি প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, বিডিনিউজ২৪-এর রাবি প্রতিনিধি আরিফুজ্জামান কোরবান এবং সমকালের রাবি প্রতিনিধি মাইনুল ইসলাম রাজু।
হামলায় যাঁদের নাম সামনে এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি ও আইন বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এম আহসান হাবীব, ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম হাসিব এবং অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বিশাল চক্রবর্তী। বিশাল পরবর্তীতে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ছাত্রদলের সহদপ্তর সম্পাদক ও সংগীত বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম ওথি, সহসভাপতি ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম, সহসভাপতি ও আইবিএর ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তকবীর হাসান ইমন এবং সহসাধারণ সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সৈয়দ সাজহারুল ইসলামের নামও হামলায় জড়িত হিসেবে এসেছে।
এ ঘটনায় শহীদ জিয়াউর রহমান হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে মতিহার থানায় মামলা করা হয়েছে। হলের উপ-রেজিস্ট্রার মোনির হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
তবে মামলার বাদী মোনির হোসেন দাবি করেছেন, মামলার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না। তাঁকে জোর করে অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে।
মোনির হোসেন বলেন, ‘৫ তারিখে প্রভোস্ট মাহবুবুর রহমান স্যার সাত্তার ভাই ও আমাকে থানায় যেতে বলেন। তিনি বলেন, আমাদের কিছু করতে হবে না, শুধু মতিহার থানায় গিয়ে স্বাক্ষর করতে হবে। আমাকে জোর করে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। মামলার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। সেখানে গিয়ে স্বাক্ষর করার সময় দেখি, আসামিদের নাম অজ্ঞাত হিসেবে দেওয়া হয়েছে। হলের প্রভোস্ট আমাকে জানিয়েছেন, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে রয়েছেন।’
হামলার শিকার সাংবাদিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে, প্রশাসন শুধু আনুষ্ঠানিকতা পূরণের জন্য মামলাটি করেছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসনের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বা দেখা করেনি। সবকিছু দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। তারপরও কেন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হলো, তা বুঝতে পারছি না। হামলাকারীদের বিচার না হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা দুর্বল, সেটিই আরও স্পষ্ট হবে।’
আরেক ভুক্তভোগী ও বিডিনিউজ২৪-এর রাবি প্রতিনিধি আরিফ উজ জামান কোরবান বলেন, ‘হল প্রশাসন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অথচ যারা সেদিন আমাদের মারধর করেছে, তারা নিয়মিত ফেসবুকে পোস্ট করছে। তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। বরং তারা আমাদের শিবিরের সদস্য ও গুপ্ত বলে প্রচার করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের কয়েকজনকে ওই ঘটনায় সম্পৃক্ততার কারণে ছাত্রদল থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। তারপরও প্রশাসন বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছে। তারা আবার আমাদের ওপর হামলা করবে না—এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ একবার হামলার শিকার হওয়ার পর এখন আবার হামলার আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
মামলার তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অর্জুন বলেন, ‘আমি ২ অক্টোবর থেকে রাজশাহীর বাইরে ছিলাম এবং গতকাল শহরে ফিরেছি। তদন্তের বিষয়ে এখনো আমি কিছু জানি না। তদন্ত কর্মকর্তাকে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলতে বলেছি। তিনি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন কি না, সেটি আমি দেখব।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি।
হামলার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ থাকার পরও মামলা হওয়ার দুই দিনেও কাউকে গ্রেফতার না করা এবং ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ না করার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হামলার শিকার সাংবাদিকরা।
সময়ের আলো/এনএন