একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, রুচিবোধ, মানসিকতা ও আচরণের অন্যতম প্রধান পরিচায়ক হলো তার কথাবার্তা। মানুষের সঙ্গে সুন্দর, নম্র, ভদ্র ও মিষ্টভাষী আচরণ যেমন সহজেই অন্যের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, তেমনি কর্কশ, রূঢ় ও কটুভাষী আচরণ মানুষের মনে কষ্ট, বিরক্তি ও দূরত্বের সৃষ্টি করে। মানুষের মুখের কথার মধ্য দিয়েই অনেক সময় তার চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তাই একজন মুমিনের জন্য কথাবার্তার ক্ষেত্রে শালীনতা, সংযম ও উত্তম আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলাম সুন্দর ও কল্যাণকর পথনির্দেশ দিয়েছে। মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে, কোন ধরনের কথা বলা উচিত এবং কোন ধরনের কথা থেকে বিরত থাকতে হবে— কুরআন ও হাদিসে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মুমিনের কথাবার্তা হবে সত্যনিষ্ঠ, মার্জিত, অর্থবহ ও কল্যাণকর।
কথা বলার অন্যতম প্রধান আদব হলো সর্বদা উত্তম ও উপকারী কথা বলা। মানুষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলা উচিত, যাতে তার মনে কষ্ট না দিয়ে বরং কল্যাণ ও সৌহার্দ সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলবে’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৮৩)। এ আয়াতের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সুন্দর ও উত্তম আচরণের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একজন মুমিনের মুখের ভাষা তার ঈমানি সৌন্দর্যেরও পরিচায়ক। এর পাশাপাশি কথাবার্তায় সত্য ও দৃঢ়তা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। মিথ্যা, গুজব, ভিত্তিহীন বক্তব্য কিংবা যাচাই-বাছাইহীন কোনো কথা একজন মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক ও সুদৃঢ় কথা বলো’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৭০)। তাই কোনো বিষয়ে কথা বলার আগে তা সত্য ও নির্ভরযোগ্য কি না, তা বিবেচনা করা উচিত। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য যাচাই না করে প্রচার করার প্রবণতা থেকে প্রত্যেক মুমিনের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
একজন মুমিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা। প্রয়োজনহীন আলোচনা, অযথা তর্ক-বিতর্ক, পরনিন্দা কিংবা এমন কোনো কথায় সময় নষ্ট করা, যার কোনো দুনিয়াবি বা পরকালীন উপকার নেই— এসব থেকে বিরত থাকা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘আর তারা অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত থাকে’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ৩)। মানুষের সময় ও জীবন আল্লাহর দেওয়া মূল্যবান আমানত; তাই একজন সচেতন মুমিন তার জিহ্বা ও সময় উভয়েরই যথাযথ ব্যবহার করবে। এ ছাড়া অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ ও কটুভাষা পরিহার করাও কথাবার্তার গুরুত্বপূর্ণ আদব। রাগ, বিরোধ কিংবা মতপার্থক্যের সময়ও একজন মুমিনের ভাষা শালীন থাকা উচিত। কাউকে অপমান করা, গালমন্দ করা, অভিশাপ দেওয়া কিংবা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা ইসলামের শিক্ষা নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন ব্যক্তি কখনো দোষারোপকারী, অভিশাপকারী, অশ্লীলভাষী ও কটুভাষী হতে পারে না’ (তিরমিজি : ১৯৭৭)। সুতরাং মতের অমিল হলেও ভদ্রতা ও শিষ্টাচার বজায় রাখা একজন মুমিনের দায়িত্ব। কথা বলার আগে চিন্তা করা, প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলা এবং নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখাও মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
লেখক : শিক্ষিকা, আল হেরা মডেল একাডেমি, কিশোরগঞ্জ