আধুনিক জীবনের গতিময়তা, অর্থ উপার্জনের অবাধ প্রতিযোগিতা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আমাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। ফলে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ, হতাশা ও ব্যর্থতার করালগ্রাসে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে স্বাভাবিক জীবন। এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী? একজন মুমিন হিসেবে সর্বপ্রথম আমাদের উচিত কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করা।
জিকির বা আল্লাহর স্মরণ : মানসিক চাপ, অস্থিরতা ও চরম হতাশা কাটিয়ে ওঠার অন্যতম এক অনবদ্য মহৌষধ হলো নিয়মিত জিকির করা। সৃষ্টিকর্তার জিকিরের মাধ্যমে মানুষের মনের ভেতরের জমে থাকা সব মানসিক চাপ লাঘব হয় এবং বিক্ষিপ্ত অন্তর পরম প্রশান্তি লাভ করে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই কেবল অন্তরগুলো প্রকৃত শান্তি লাভ করে’। (সুরা রাদ, আয়াত : ২৮)
সালাত আদায় : অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও হতাশা একজন মানুষকে সমাজ ও পরিজন থেকে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ করে দেয়। এমতাবস্থায় একা একা বিমর্ষ না থেকে সালাত আদায় করা মনকে যেমন হালকা করে, তেমনি যেকোনো গভীর মানসিক চাপ ও হতাশার অন্ধকার থেকেও মুক্তি দেয়। পবিত্র কুরআনের সুরা আল-বাকারার ১৫৩ নং আয়াতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবসময় ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই আছেন’।
এ ছাড়া রাতের শেষ তৃতীয়াংশে মনোযোগের সঙ্গে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করা আত্মিক শক্তি বৃদ্ধি ও মানসিক প্রশান্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
ইসতিগফার পাঠ : নিয়মিত ইসতিগফার পাঠ মানুষের অন্তরকে যাবতীয় পাপ থেকে পরিশুদ্ধ করে, মনের ভেতরের লুকানো মানসিক চাপ কমায় এবং সরাসরি আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ সুগম করে তোলে। মহানবী রাসুল (সা.) প্রতিদিন নিজ জীবনে সত্তরবারেরও বেশি ইসতিগফার পাঠ করতেন (বুখারি : ৬৩০৭)।
এ ছাড়া রাসুল (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইসতিগফার পাঠ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে সব সংকট থেকে মুক্তি, সব দুশ্চিন্তা থেকে প্রশান্তি এবং ধারণাতীত অপ্রত্যাশিত উৎস থেকে রিজিকের সুব্যবস্থা করে দেবেন’। (আবু দাউদ : ১৫১৮)
তাওয়াক্কুল ও সবর : জীবনের সর্বাবস্থায় একজন প্রকৃত মুমিনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখা। কারণ একমাত্র আল্লাহর ওপর অগাধ তাওয়াক্কুলের মাধ্যমেই জীবনের সব লৌকিক ও অলৌকিক হতাশা কাটিয়ে ওঠা সম্পূর্ণ সম্ভব। আর ধৈর্য বা সবরের মাধ্যমে মনের যাবতীয় মানসিক চাপ স্থায়ীভাবে দূর করা যায়।
বর্তমান আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট’ বা ‘কোপিং মেকানিজম’ বলা হয়, ইসলাম ধর্ম আজ থেকে হাজার বছর আগেই তাওয়াক্কুল ও সবরের মতো চমৎকার ধারণার মাধ্যমে তার চেয়েও অনেক বেশি নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত সমাধান বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছে। পবিত্র কুরআনের সুরা আল-ইনশিরাহর ৫ ও ৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রতিটি কঠিন কষ্টের সঙ্গেই পরম স্বস্তি ও শান্তি রয়েছে।
লেখক : শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়