সাশ্রয়ী আবাসন ছাড়া স্মার্ট সিটির স্বপ্ন অধরা

আইয়্যুব খসরু

বিবিধ

একটি শহরকে শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক বা আধুনিক প্রযুক্তির উপস্থিতি দিয়ে স্মার্ট বলা যায় না। মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, সাশ্রয়ী

2026-10-08T15:34:55+00:00
2026-10-08T15:34:55+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬,
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
বিবিধ
সাশ্রয়ী আবাসন ছাড়া স্মার্ট সিটির স্বপ্ন অধরা
আইয়্যুব খসরু
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩৪ পিএম 
মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব আবাসন নিশ্চিত করাই একটি আধুনিক ও টেকসই নগরের অন্যতম প্রধান শর্ত। সংগৃহীত ছবি
একটি শহরকে শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক বা আধুনিক প্রযুক্তির উপস্থিতি দিয়ে স্মার্ট বলা যায় না। মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব আবাসন নিশ্চিত করাই একটি আধুনিক ও টেকসই নগরের অন্যতম প্রধান শর্ত। বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণের বাস্তবতায় আবাসন সংকট এখন বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ নতুন হাউজিং ব্যাকলগ তৈরি হচ্ছে। ফলে শুধু আবাসন নির্মাণ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না; একই সঙ্গে আবাসনকে স্মার্ট, পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নগর উন্নয়নের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপান গত পাঁচ-ছয় দশকে ব্যাপক উন্নতি করেছে। সীমিত সম্পদ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সিউল ও সিঙ্গাপুর আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরে পরিণত হয়েছে। তবে এসব দেশের মডেল সরাসরি অনুসরণ না করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিজেদের জন্য উপযোগী কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

স্মার্ট সিটি ও স্মার্ট আবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি এখনও সীমিত। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তাই শুধু পরিকল্পনা ও নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগের মাধ্যমে আবাসনের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি এর মান উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

আবাসন খাতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশে উৎপাদিত মোট এনার্জির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আবাসিক খাতে ব্যবহৃত হয়। আবাসিক ভবনগুলোকে স্মার্ট, গ্রিন ও জ্বালানিসাশ্রয়ী করা গেলে জাতীয় পর্যায়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এনার্জি সাশ্রয় করা সম্ভব।

স্মার্ট আবাসন বলতে শুধু আধুনিক প্রযুক্তি, সোলার প্যানেল বা ডিজিটাল গ্যাজেট ব্যবহারে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। ভবনের নকশা এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে, পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমে এবং ভবনের পুরো জীবনচক্রে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় কম থাকে।

এ জন্য ভবন নির্মাণের শুরুতেই প্যাসিভ ডিজাইন কৌশলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ভবনের সঠিক ওরিয়েন্টেশন, প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু চলাচল এবং তাপ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো নকশার পর্যায়েই নিশ্চিত করা সম্ভব। রাজউকসহ অন্যান্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের এসব বিষয় বাধ্যতামূলক করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

এর পাশাপাশি সোলার এনার্জি ব্যবহার, এনার্জি অডিট, বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো এবং পানির চাহিদা কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এসব উদ্যোগের অনেকগুলো বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ছাড়াই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন সম্ভব। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, নীতিগত অগ্রাধিকার ও কার্যকর বাস্তবায়ন।

তবে একটি ভবনকে শুধু ভবনের ভেতরের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে স্মার্ট বলা যাবে না। ভবনটির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো আবাসিক ভবন পরিবেশবান্ধব হলেও সেটি যদি কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, চিকিৎসা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা থেকে দূরে হয়, তাহলে বাসিন্দাদের দীর্ঘ পথ যাতায়াত করতে হবে। এতে পরিবহন ব্যয়, জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ, সবই বাড়বে।


তাই স্মার্ট আবাসন পরিকল্পনায় পরিবহন ও অবকাঠামোকেও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবা কতটা কাছে এবং আবাসিক এলাকা থেকে হেঁটে বা সহজ পরিবহনে প্রয়োজনীয় স্থানে যাওয়া যায় কি না, এসবও টেকসই নগরের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

আবাসন খাতে অর্থায়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৮৯৮ শতাংশের সমপরিমাণ মর্টগেজ ফাইন্যান্স রয়েছে। বিপরীতে চীনে এ হার প্রায় ৩০ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৫০ শতাংশেরও বেশি। এই ব্যবধান আবাসন ও নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্ব তুলে ধরে।

শুধু আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা করলেই হবে না; সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং ফাইন্যান্স, মর্টগেজ ব্যবস্থা এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগও বাড়াতে হবে। আবাসন মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেলে টেকসই নগরায়ণের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

সিউল, জাপান ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য বড় শিক্ষা হতে পারে, সঠিক নীতি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগের মাধ্যমে সীমিত সম্পদ দিয়েও নগর ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কিছু কাঠামোও রয়েছে। বিএনবিসি গাইডলাইন, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করা স্রেডার মতো প্রতিষ্ঠান এবং এনডিসির আওতায় গ্রিনিং ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর কৌশল রয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পনা, পরিমাপ ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি একেবারে নেই— এমন নয়।

তবে বড় সমস্যা হচ্ছে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন, বড় পরিসরে প্রয়োগ এবং অর্থায়ন। নীতিমালা ও গাইডলাইন থাকলেও সেগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

স্মার্ট ও টেকসই আবাসনের ক্ষেত্রে তাই প্রথমেই পর্যাপ্ত আবাসন সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সেই আবাসনকে জ্বালানিসাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে।

আবাসন, অর্থায়ন, পরিবহন, অবকাঠামো ও পরিবেশকে আলাদা বিষয় হিসেবে না দেখে সমন্বিত নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ স্মার্ট নগরায়ণ কোনো বিলাসী ধারণা নয়; ভবিষ্যৎ নগর জীবনের জন্য এটি একটি প্রয়োজন।

পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবায়নের যোগসূত্র এবং আবাসনের সঙ্গে অর্থায়নের সংযোগ যত দ্রুত শক্তিশালী করা যাবে, তত দ্রুত বাংলাদেশ টেকসই ও বাসযোগ্য নগরায়ণের পথে এগিয়ে যেতে পারবে। 


সময়ের আলো/ইউএমএইচ
  বিষয়:   সাশ্রয়ী আবাসন  স্মার্ট সিটি 


Advertisement
Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: