মানুষের সম্মান তার জীবনের মূল্যবান সম্পদ। অর্থ-সম্পদ হারিয়ে গেলে অনেক সময় তা ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু মানুষের মর্যাদা একবার ক্ষুণ্ন হলে সেই ক্ষত সহজে পূরণ হয় না। ইসলাম তাই মানুষের সম্মান, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো কথা বলা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে, তা গিবত। আর কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে মিথ্যা, ভিত্তিহীন বা অসত্য অভিযোগ প্রচার করা অপবাদ। উভয়ই ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আগে গিবত ও অপবাদ সাধারণত মানুষের মুখের কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এর বিস্তৃতি অনেক বেড়েছে। একটি পোস্ট, মন্তব্য, ছবি, ভিডিও কিংবা বার্তা মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। আগে একজনের মুখের একটি কথা যেমন কয়েকজন মানুষ শুনত, এখন একটি লেখা বা মন্তব্য হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একজন মুসলমানকে তার কথাবার্তার মতোই নিজের লেখা ও শেয়ার করা বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।
গিবতের ভয়াবহতা : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কোনো কোনো ধারণা পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অন্যের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা করো। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী, পরম দয়ালু’ (সুরা হুজুরাত : ১২)। গিবতের ভয়াবহতা বোঝাতে আল্লাহ তায়ালা এমন একটি উপমা দিয়েছেন, যা মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া যেমন মানুষের স্বভাবগতভাবেই ঘৃণ্য, তেমনি একজন মুসলমানের অনুপস্থিতিতে তার সম্মানহানি করাও অত্যন্ত নিন্দনীয়। মাআরিফুল কুরআনে মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) গিবতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ বা বিষয় উল্লেখ করা, যা সে শুনলে কষ্ট পাবে, তা গিবতের অন্তর্ভুক্ত।
কথাটি সত্য হলে গিবত, আর কথাটি সত্য না হলে তা মিথ্যা অপবাদে পরিণত হয়। গিবত শুধু মুখে বলার মাধ্যমেই হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও দোষ নিয়ে পোস্ট দেওয়া, তার ব্যক্তিগত দুর্বলতা প্রকাশ করা, তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা, ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করা কিংবা এমন কোনো বিষয় প্রচার করা, যাতে তার সম্মান ক্ষুণ্ন হয়, এসবও গিবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
যাচাই ছাড়া তথ্য নয় : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো যাচাই না করে কোনো খবর বা অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন তোমরা তা মুখে মুখে গ্রহণ করছিলে এবং এমন কথা বলছিলে, যার কোনো জ্ঞান তোমাদের ছিল না; আর তোমরা তা তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে তা ছিল অত্যন্ত গুরুতর’ (সুরা নুর : ১৫)। ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় সতর্ক করেছেন, কোনো কথা শুনে তা যাচাই না করে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। মানুষের কাছে কোনো কথা সামান্য মনে হলেও আল্লাহর কাছে তা গুরুতর হতে পারে। বর্তমান সময়ে এই সতর্কতার গুরুত্ব আরও বেশি। কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে অভিযোগ উঠল, একটি ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল, কিংবা কোনো ঘটনার অসম্পূর্ণ তথ্য সামনে এলো, অনেকে যাচাই না করেই তা শেয়ার করতে শুরু করেন। কেউ বলেন, ‘শুনেছি’; কেউ বলেন, ‘সবাই তো বলছে’; আবার কেউ শুধু অন্যের পোস্ট দেখে সেটিকে সত্য ধরে নেন।
কিন্তু একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো কোনো তথ্য গ্রহণ ও প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা। কারণ একটি ভুল তথ্য শুধু একজন মানুষের সম্মান নষ্ট করে না, এর প্রভাব তার পরিবার, কর্মজীবন ও সামাজিক সম্পর্কের ওপরও পড়তে পারে। অনেকে মনে করেন, কোনো মিথ্যা বা অপমানজনক কথা তিনি নিজে তৈরি করেননি, শুধু অন্যের পোস্ট শেয়ার করেছেন। তাই তার কোনো দায় নেই। কিন্তু একজন সচেতন মুসলমানের এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
মুমিনের ভাষা হোক সুন্দর : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো খারাপ বিষয় নয়। এর মাধ্যমে জ্ঞান, শিক্ষা, ভালো কথা ও কল্যাণের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। কিন্তু এর অপব্যবহার মানুষকে এমন গুনাহে জড়িয়ে ফেলতে পারে, যা সে হয়তো সামনাসামনি কখনো করত না। কাউকে নিয়ে কটূক্তি করা, উপহাস করা, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা, পুরোনো ভুল নিয়ে তাকে হেয় করা, যাচাইহীন অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা কারও সম্মানহানিকর পোস্টে উৎসাহ দেওয়া, এসব বিষয়ে একজন মুমিনের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তাই কোনো পোস্ট শেয়ার বা মন্তব্য করার আগে কয়েক মুহূর্ত থেমে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে, কথাটি কি সত্য? এর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে কি? এটি প্রকাশ করা কি প্রয়োজনীয়? এতে কারও সম্মান বা অধিকার ক্ষুণ্ন হবে কি? আল্লাহর সামনে এ কাজের জবাব দিতে হলে আমি কি এর দায়িত্ব নিতে পারব?
মুমিনের শক্তি শুধু সে কত কথা বলতে পারে তার মধ্যে নয়; বরং কোন কথা বলা থেকে সে নিজেকে বিরত রাখতে পারে তার মধ্যেও প্রকাশ পায়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের প্রতিটি শব্দের ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। কারণ মুখের কথা যেমন আমলের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি আমাদের লেখা, মন্তব্য ও প্রচারিত কথাও সেই হিসাবের বাইরে নয়।
মানুষের সম্মান রক্ষা করা কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি একজন মুসলমানের নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গিবত ও অপবাদের মাধ্যম না বানিয়ে সত্য, কল্যাণ ও সুন্দর কথার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। কোনো কথা শুনলেই ছড়িয়ে না দিয়ে যাচাই করি, কারও দুর্বলতা প্রকাশ না করে তা গোপন রাখি এবং এমন কিছু লেখা বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকি, যা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য জবাবদিহির কারণ হতে পারে।