গাজা ছেড়েছেন দুই বছরেরও বেশি আগে। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফেরে রিম সালিমকে। মিসরে আজানের শব্দ শুনলে তার বুক ধড়ফড় করে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আকাশে উড়োজাহাজ দেখলেও মনে হয়, বুঝি ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে হামলা চালাতে আসছে যুদ্ধবিমান। যুদ্ধের সময়ের অভিজ্ঞতা তার মনে এমন ভয় তৈরি করেছে, যা ভৌগোলিকভাবে গাজা ছেড়ে এসেও কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।
২০২৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি গাজা ছেড়েছিলেন রিম। শারীরিকভাবে যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরলেও এর ক্ষত এখনো তার শরীর ও মনে রয়ে গেছে। বিভিন্ন দৃশ্য ও শব্দ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় যুদ্ধের ভয়াবহ মুহূর্তগুলোতে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে পরিবারের সঙ্গে টেলিভিশনে খবর দেখছিলেন রিম। পাশের মসজিদ থেকে ভেসে আসছিল আজানের ধ্বনি। হঠাৎ ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে তাদের প্রতিবেশীর বাড়িতে আঘাত হানে। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বারুদের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছিল তার। বড় একটি পাথরের টুকরো জানালার কাচ ভেঙে তার কয়েক সেন্টিমিটারের মধ্যে এসে পড়ে। তখন তার মনে হয়েছিল, মৃত্যু আসন্ন। ভয়ে শাহাদাতের বাণী উচ্চারণ করেছিলেন তিনি।
সেই ঘটনার পর থেকে আজানের শব্দ শুনলেই ওই মুহূর্তের কথা মনে পড়ে রিমের। মিসরে বসবাস করেও তাই আজানের ধ্বনি তার মনে প্রশান্তির বদলে আতঙ্ক তৈরি করে।
যুদ্ধের আরেকটি ভয়াবহ স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার আঙুলের সঙ্গে। নিজেদের এলাকায় বারবার হামলার কারণে পরিবারের সঙ্গে দেইর আল-বালাহতে দাদির বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে আরও অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষ ছিলেন। একদিন ঘরের অন্ধকারে বসে থাকার সময় কাছেই একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হয়।
রিমের ছোট ভাইয়ের এক কানে আগে থেকেই কম শোনার সমস্যা ছিল। বিস্ফোরণের শব্দে অন্য কানটিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় ভাইয়ের কান্না শুনে তার দিকে ছুটে যান রিম। ভাইকে মায়ের কাছে যেতে বলার সময় ঘরে থাকা আরেক শিশু দরজাটি সজোরে বন্ধ করে দেয়। এতে দরজা ও চৌকাঠের মাঝে আটকে যায় তার আঙুল। আঙুলের আগার অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং নখ উঠে যায়।
আল-আকসা শহিদ হাসপাতালে কোনো অবশকারী ওষুধ ছাড়াই তার আঙুলে সেলাই দেওয়া হয়। ক্ষত সেরে উঠলেও ওই ঘটনার পর থেকে দরজা নিয়ে একধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে তার। এখন কাউকে দরজার চৌকাঠের কাছে হাত রাখতে দেখলেও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি।
যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে তার শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও। বাস্তুচ্যুত অবস্থায় দীর্ঘ সময় শক্ত মেঝেতে বসে থাকার কারণে লেজের হাড়ের আশপাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হয়েছে বলে জানান রিম। শুরুতে ভেবেছিলেন, সময়ের সঙ্গে ব্যথা সেরে যাবে। যুদ্ধ শেষ হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তার। কিন্তু ব্যথা স্থায়ী হয়ে যায়।
মিসরের এক চিকিৎসক তাকে লেজের হাড় অপসারণের অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছেন। তবে ওই অস্ত্রোপচারে গুরুতর জটিলতার আশঙ্কা থাকায় ব্যথা নিয়েই জীবনযাপনের চেষ্টা করছেন তিনি।
রিমের উপলব্ধি, সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়—এ কথা তার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। যুদ্ধের তিন বছর পরও কিছু শব্দ, দৃশ্য ও পরিস্থিতি তার শরীরকে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করে, যেন বিপদ এখনো সামনে।
তাই গাজা ছেড়ে আসতে পারলেও যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মুক্ত হতে পারেননি রিম সালিম। তার প্রশ্ন, শরীর যখন এখনো যুদ্ধের আতঙ্কে বন্দি, তখন কীভাবে বলা যায় যে তিনি যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরেছেন?
সূত্র : মিডিল ইস্ট আই
সময়ের আলো/জেডি