ফিলিস্তিনিদের কৃষি ঐতিহ্যও কেড়ে নিচ্ছে ইসরায়েলিরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ফিলিস্তিনিদের জমিতে জলপাই সংগ্রহ করছেন ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা। তাদের হামলা, জমিতে প্রবেশে বাধা এবং জলপাইগাছ উপড়ে ফেলার ঘটনায় অধিকৃত পশ্চিম তীরে

2026-10-09T08:08:01+00:00
2026-10-09T08:08:59+00:00
 
  শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
জলপাই বাগান দখল
ফিলিস্তিনিদের কৃষি ঐতিহ্যও কেড়ে নিচ্ছে ইসরায়েলিরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:০৮ এএম  আপডেট: ০৯.১০.২০২৬ ৮:০৮ এএম
একজন ফিলিস্তিনি নারী জলপাই তুলছেন। ছবি : সংগৃহীত
ফিলিস্তিনিদের জমিতে জলপাই সংগ্রহ করছেন ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা। তাদের হামলা, জমিতে প্রবেশে বাধা এবং জলপাইগাছ উপড়ে ফেলার ঘটনায় অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কৃষকদের জীবিকা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়েছে।

ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ব্যক্তি লম্বা কাঠের লাঠি দিয়ে জলপাইগাছে আঘাত করছেন। গাছ থেকে ফল ঝরিয়ে তারা হাসিমুখে একে অপরকে অভিনন্দন জানান। ভিডিওতে তারা সংগ্রহ করা জলপাইকে ‘বিশুদ্ধ জলপাই তেল’ তৈরির উপকরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। 

তবে ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী বাশার কারিউতির ভাষ্য, ওই দুই ব্যক্তির জমি, গাছ কিংবা জলপাইয়ের ওপর কোনো মালিকানা নেই। তারা অধিকৃত পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের কুরইয়ুত গ্রামের ব্যক্তিমালিকানাধীন ফিলিস্তিনি জমিতে গড়ে তোলা একটি অবৈধ বসতি-চৌকি থেকে এসে জলপাই সংগ্রহ করেছেন। ওই বাগানটি ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে।

ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে হিব্রু ভাষায় বলতে শোনা যায়, ‘সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, প্রায় তিন বছর ধরে এখানে কেউ আসেনি।’

স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা ওই ব্যক্তিকে আভিচাই সুইসা নামে চেনেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এই ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী ওই বসতি-চৌকিতে একটি খামার পরিচালনা করেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রও তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। দেড় বছরেরও বেশি আগে প্রতিষ্ঠিত খামারটির জন্য অনুদান সংগ্রহেও এ ধরনের ভিডিও ব্যবহার করা হচ্ছে।

নিজের প্রচারাভিযানের পৃষ্ঠায় সুইসা বলেছেন, একসময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ভেঙে দিয়েছিল এমন খামারটি পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ করাই তাদের লক্ষ্য, যাতে এটি ‘শত্রুর হাতে’ না পড়ে। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা ধীরে ধীরে এই এলাকায় কাজ শুরু করছি।’

কিন্তু জমিটির মালিক কুরইয়ুত গ্রামের ফিলিস্তিনিরা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা সেখানে যেতে পারছেন না। কারিউতি জানান, কয়েক মাস আগে কৃষকেরা জমি চাষ করতে গেলে ইসরায়েলি সেনারা তাঁদের বাধা দেয়।

জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে সহিংসতা

কারিউতির ভাষ্য, অভিযোগ জানানোর পর কয়েক দিন আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ওই এলাকাকে ‘বন্ধ সামরিক এলাকা’ ঘোষণা করে। এরপর বসতিস্থাপনকারীরা জলপাই চুরির জন্য অন্য জমির দিকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের জলপাই সংগ্রহের মৌসুম ঘিরে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা ক্রমেই বাড়ছে। অক্টোবরের এই মৌসুম ফিলিস্তিনি কৃষকদের জন্য আনন্দ ও পারিবারিক মিলনমেলার বদলে ভয় ও অনিশ্চয়তার সময়ে পরিণত হয়েছে। মৌসুমের শুরুতেই অনেকে চলতি বছরকে বসতিস্থাপনকারীদের হামলার দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ বলে বর্ণনা করছেন।

বুধবার অধিকৃত পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলে রামিন ও বুরকা গ্রামের মধ্যবর্তী জমিতে ট্রাক্টর নিয়ে সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা হামলা চালায়। গাছ থেকে জলপাই সংগ্রহ করতে যাওয়া কৃষকদের লক্ষ্য করে তারা গুলি চালায়। এতে ৪৪ বছর বয়সী কৃষক আলী বাজ্জারি নিহত হন। তার পরিবারের ভাষ্য, জলপাই সংগ্রহ করতে যাওয়াই ছিল তার একমাত্র ‘অপরাধ’।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, আহতদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে বাধা দেয় ইসরায়েলি সেনারা। পরে ফিলিস্তিনিরা পাহাড়ি পথ দিয়ে আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিয়ে যান।

ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ইয়েশ দিন জানিয়েছে, ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত ৭৫টি ফিলিস্তিনি জনপদে জলপাই সংগ্রহের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট সহিংসতার ১০৯টি ঘটনা তারা নথিভুক্ত করেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১টি ঘটনা ঘটেছে।

প্রজন্মের পর প্রজন্মের ঐতিহ্য

জলপাই সংগ্রহ ফিলিস্তিনিদের কাছে শুধু কৃষিকাজ নয়; এটি জমির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও বন্ধুরা একসঙ্গে বাগানে গিয়ে ফল সংগ্রহ করেন। পারস্পরিক সহযোগিতার এই রীতিকে আরবিতে বলা হয় ‘আউনেহ’।

কাজটি পরিশ্রমসাধ্য হলেও মৌসুমটি ঘিরে থাকে উৎসবের আমেজ। কার জমির জলপাই থেকে সবচেয়ে ভালো তেল হয়, কে বেশি ফল সংগ্রহ করতে পারেন কিংবা কার তেলের দাম বেশি হওয়া উচিত—এসব নিয়ে চলে হাসি-ঠাট্টা ও আলোচনা।

বয়োজ্যেষ্ঠরা নতুন প্রজন্মকে শেখান কখন জলপাই সংগ্রহ করা ভালো, কীভাবে গাছের পরিচর্যা করতে হয় এবং কীভাবে আবহাওয়া ও জমির বৈশিষ্ট্য বুঝতে হয়। এভাবেই কৃষিজ্ঞান ও জমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়।

একটি বহুল প্রচলিত আরবি প্রবাদে বলা হয়, ‘তারা গাছ লাগিয়েছেন, যাতে আমরা খেতে পারি। আমরা গাছ লাগাই, যাতে তারা খেতে পারে।’ প্রবাদটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্বের কথাই তুলে ধরে।

অন্যদিকে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন নতুন খামার গড়ে তুলে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের কেউ কেউ জলপাই সংগ্রহ ও তেল তৈরির রীতিও অনুসরণ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওতে তাদের জলপাই থেকে তেল তৈরি করতে দেখা যায়। কোথাও আবার ইসরায়েলিদের এই অভিজ্ঞতায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।

ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, নিজেদের জমি থেকে তাদের উচ্ছেদ করে তাদেরই ঐতিহ্য নিজেদের বলে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

গাছ উপড়ে জীবিকায় আঘাত

শুধু বসতিস্থাপনকারীরাই নন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযানেও জলপাইগাছ ধ্বংস হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ফিলিস্তিনি কৃষকেরা।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেইত রিমা গ্রামের ৬১ বছর বয়সি কৃষক হাজেম সানাফ কাছের একটি পাহাড় থেকে দেখেন, ইসরায়েলি সামরিক আদেশের পর বুলডোজার দিয়ে তাঁর ও এক প্রতিবেশীর জমির ৪০০টিরও বেশি জলপাইগাছ উপড়ে ফেলা হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েক দশক পুরোনো গাছও ছিল। এসব গাছই ছিল তাঁদের আয়ের একমাত্র উৎস।

সানাফ বলেন, ‘তারা শুধু আমাদের কাছ থেকে জলপাইগাছগুলো কেড়ে নিতে চায়।’

অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় জলপাইগাছ উপড়ে ফেলার একাধিক সামরিক আদেশ দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তা কার্যকরও করা হয়েছে; অন্যগুলো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। অতীতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিরাপত্তাঝুঁকি কিংবা সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা ঠেকাতে গাছ সরানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। তবে ফিলিস্তিনিদের দাবি, এর মাধ্যমে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।


ফিলিস্তিনের উপনিবেশায়ন ও দেয়াল প্রতিরোধ কমিশনের (সিআরআরসি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরেই ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী ও সেনারা প্রায় ৫০ হাজার গাছ ধ্বংস করেছে।

রামাল্লার কাছে আল-লুব্বান আশ-শারকিয়া গ্রামের ফুয়াদ দারাগমেহ একটি ভাঙা জলপাইগাছের মোটা কাণ্ড হাতে নিয়ে বলেন, ‘আমি ৩০ বছর ধরে এটির যত্ন নিয়েছি।’ এরপর তিনি বাড়ির পথে রওনা হন।

কেউ কেউ উপড়ে ফেলা গাছ আবার বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন। অন্যরা শেষবারের মতো ফল সংগ্রহ করছেন। তাদের আশঙ্কা, হয়তো এই ফসলই তাঁদের শেষ জলপাই সংগ্রহ।

বসতিস্থাপনকারীদের জলপাই সংগ্রহের ভিডিও দেখে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভের পাশাপাশি গাছের পরিচর্যা নিয়ে সমালোচনাও দেখা দিয়েছে। এক ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীর ভাষ্য, কয়েক দশক ধরে যারা জমির পরিচর্যা করেছেন, তারা জানেন—সুইসার মতো জোরে লাঠি দিয়ে গাছে আঘাত করা জলপাই সংগ্রহের সঠিক পদ্ধতি নয়; এতে গাছেরও ক্ষতি হতে পারে। 

সময়ের আলো/জেডি
  বিষয়:   ফিলিস্তিনি  কৃষি ঐতিহ্য  ইসরায়েলি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: