অনলাইন বিনোদন বনাম আত্মশুদ্ধির সময়

মুহিবুল হাসান রাফি

ইসলাম

স্মার্টফোনের পর্দা এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের অবসর, বিনোদন, জ্ঞানচর্চা এমনকি চিন্তারও বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। কয়েক সেকেন্ডের

2026-10-09T14:13:49+00:00
2026-10-09T14:19:12+00:00
 
  শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
ইসলাম
অনলাইন বিনোদন বনাম আত্মশুদ্ধির সময়
মুহিবুল হাসান রাফি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ২:১৩ পিএম  আপডেট: ০৯.১০.২০২৬ ২:১৯ পিএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
স্মার্টফোনের পর্দা এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের অবসর, বিনোদন, জ্ঞানচর্চা এমনকি চিন্তারও বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও থেকে শুরু করে নাটক, সিনেমা, গান, গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম— বিনোদনের দরজা যেন সারাক্ষণ খোলা। সমস্যা বিনোদনে নয়; সমস্যা তখনই, যখন বিনোদন অবসরকে গ্রাস করে দায়িত্বকে সরিয়ে দেয়, ইবাদতকে পিছিয়ে দেয় এবং আত্মশুদ্ধির সময়টুকুও কেড়ে নেয়। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ ও বিশ্রামের বিরোধিতা করে না। কিন্তু ইসলাম সময়কে অত্যন্ত মূল্যবান আমানত হিসেবে বিবেচনা করে। 

পবিত্র কুরআনে সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে বলা হয়েছে, ‘যারা অনর্থক বিষয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়’ (সুরা আল-মুমিনুন, ২৩ : ৩)। অর্থাৎ একজন মুমিনের জীবনে এমন কিছু থাকা উচিত নয়, যা তার সময় ও মনকে অর্থহীন ব্যস্ততায় আটকে রাখে। আজকের অনলাইন বিনোদনের সবচেয়ে বড় সংকট হলো এর শেষ নেই। একটি ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি সামনে আসে। একটি পোস্ট দেখার পর অ্যালগরিদম হাজির করে আরও অনেক পোস্ট। ‘আর পাঁচ মিনিট’ বলতে বলতে কখন এক ঘণ্টা পার হয়ে যায়, অনেকেই তা টেরও পান না। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত— স্বাস্থ্য ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি, ৬৪১২)

অবসর তাই নিছক ফাঁকা সময় নয়, এটি একটি সুযোগ। এই সুযোগ কেউ জ্ঞান অর্জনে ব্যবহার করতে পারে, কেউ পরিবারকে সময় দিতে পারে, কেউ শরীরচর্চা করতে পারে, কেউ কুরআন পড়তে পারে, আবার কেউ প্রয়োজনীয় বিনোদনের মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি পেতে পারে। কিন্তু যখন অবসর জীবনের উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিংয়ে হারিয়ে যায়, তখন ক্ষতি শুধু সময়ের নয়; মনোযোগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও চিন্তার গভীরতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরও বড় প্রশ্ন কনটেন্টের মান নিয়ে; অনলাইনে যা দেখা যায় তার সবকিছু দেখার উপযোগী নয়। অশালীনতা, গিবত, বিদ্রুপ, মিথ্যা, অপমানজনক কনটেন্ট কিংবা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে হাসাহাসি, এসব ধীরে ধীরে মানুষের রুচি ও মানসিকতাকে প্রভাবিত করতে পারে। একজন মুসলমানের জন্য তাই আমি কতক্ষণ অনলাইনে ছিলাম এই প্রশ্নের পাশাপাশি কী দেখলাম এবং কী ছড়ালাম এই প্রশ্নও জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে (সহিহ মুসলিম, ৪৭)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখন মুখের কথাই শুধু কথা নয়; একটি কমেন্ট, শেয়ার, পোস্ট কিংবা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়াও আমাদের বক্তব্যের অংশ। তাই অনলাইনে কিছু প্রকাশ বা প্রচারের আগে ভাবতে হবে এটি কি সত্য, উপকারী ও শালীন?

আত্মশুদ্ধির সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় বড় কোনো পাপ নয়, বরং ছোট ছোট অসচেতনতা। নামাজের সময়েও ফোন হাতে থাকা, কুরআন পড়ার সময় না পাওয়া, ঘুমানোর আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করা, পরিবারের সঙ্গে বসেও পর্দা থেকে চোখ না সরানো এসব অভ্যাস ধীরে ধীরে মানুষের সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দেয়। অথচ আত্মশুদ্ধি শুরু হয় নিজের সময় ও প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এখানে প্রযুক্তি ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা। দিনের নির্দিষ্ট সময় বিনোদনের জন্য রাখা যেতে পারে। নামাজ, পড়াশোনা, ঘুম, পরিবার ও প্রয়োজনীয় দায়িত্বের সময়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা, উদ্দেশ্যহীন স্ক্রলিং কমানো এবং উপকারী কনটেন্ট বেছে নেওয়াও আত্মনিয়ন্ত্রণের অংশ হতে পারে। 

একই সঙ্গে প্রতিদিন কিছু সময় কুরআন তেলাওয়াত, ইসলামি জ্ঞানচর্চা, বইপড়া ও আত্মসমালোচনার জন্য রাখা দরকার। প্রশ্নটি তাই অনলাইন বিনোদন ভালো না খারাপ এত সরল নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বিনোদন কি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি আমরা বিনোদনকে নিয়ন্ত্রণ করছি? যে বিনোদন নামাজ নষ্ট করে, দায়িত্বে গাফিল করে, অশালীনতার দিকে টানে কিংবা অমূল্য সময় গ্রাস করে, সেখানেই সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন। আর যে বিনোদন সীমিত, শালীন ও দায়িত্ব পালনের পর মানসিক প্রশান্তি দেয়, সেটিকে একইভাবে বিচার করার সুযোগ নেই। সময়ের মূল্য বোঝাতে ইসলাম যে সতর্কতা দিয়েছে, তার তাৎপর্য আজ আরও গভীর। 

কারণ অর্থ হারালে তা আবার উপার্জন করা যায়, কিন্তু চলে যাওয়া একটি ঘণ্টাও ফিরিয়ে আনা যায় না। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আমাদের আরও একটি ভিডিও, আরও একটি পোস্ট, আরও একটি স্ক্রলের প্রলোভন দেখাবে। কিন্তু আমাদের জীবনের সময় সীমিত। তাই ডিজিটাল যুগে আত্মশুদ্ধির একটি নতুন অঙ্গীকার প্রয়োজন— পর্দার আলো যেন হৃদয়ের আলোকে ঢেকে না দেয়। বিনোদন থাকবে, প্রযুক্তিও থাকবে; কিন্তু নামাজ, চরিত্র, জ্ঞান, দায়িত্ব ও আল্লাহর স্মরণ যেন তার নিচে চাপা না পড়ে। দিন শেষে প্রশ্ন হওয়া উচিত আজ অনলাইনে কত সময় কাটালাম, তা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া সময়ের কতটুকু অর্থপূর্ণ কাজে ব্যয় করলাম। কারণ জীবনের শেষ হিসাব স্ক্রিন-টাইমের নয়, সময়ের আমানত কীভাবে ব্যবহার করেছি সেই হিসাবের।

সময়ের আলো/জেডআই

  বিষয়:   ইসলাম 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: