ছয় দশক ধরে বিনা মূল্যে পাঠদান, প্রধানমন্ত্রীর সম্মাননা পেলেন রমণী কান্ত

রাহাদ সুমন, বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি

সারাদেশ

মন্দিরের আঙিনায় টিনের একচালা ঘর। নেই আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, চেয়ার-টেবিল কিংবা বেঞ্চ। বেতনভুক্ত কোনো শিক্ষকও নেই। অথচ সেখানেই ছয় দশক ধরে

2026-10-09T15:50:54+00:00
2026-10-09T15:50:54+00:00
 
  শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
ছয় দশক ধরে বিনা মূল্যে পাঠদান, প্রধানমন্ত্রীর সম্মাননা পেলেন রমণী কান্ত
রাহাদ সুমন, বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৫০ পিএম 
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রমণী কান্ত বেপারীকে সম্মাননা সনদ দেন। ছবি : সংগ্রহীত
মন্দিরের আঙিনায় টিনের একচালা ঘর। নেই আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, চেয়ার-টেবিল কিংবা বেঞ্চ। বেতনভুক্ত কোনো শিক্ষকও নেই। অথচ সেখানেই ছয় দশক ধরে শিশুদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন অশীতিপর রমণী কান্ত বেপারী। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি যে পাঠদানের শুরু করেছিলেন, বয়সের ভারেও তাতে ছেদ পড়েনি। বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাংতা গ্রামের এই শিক্ষকের পাঠশালায় বিনা মূল্যে পড়েছে তিন প্রজন্মের শিশু। শিক্ষা ক্ষেত্রে তার দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এবার তাকে সম্মাননা দিয়েছে সরকার।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সম্প্রতি ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রমণী কান্ত বেপারীর গলায় পদক পরিয়ে দেন। এ সময় তাকে দুই লাখ টাকার চেক ও সম্মাননা সনদও দেওয়া হয়।

স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন, সবার প্রিয় ‘রমণী স্যার’। প্রত্যন্ত রাংতা গ্রামের শিশুদের কাছে তার পরিচয় এই নামেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার কাছে হাতেখড়ি নিয়েছে। বয়স ৭০ পেরোলেও শিশুদের পড়ানোর আগ্রহে ভাটা পড়েনি তাঁর।

রমণী কান্ত যখন নিজে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তখন থেকেই এলাকার দরিদ্র শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের পাঠদানের সেই যাত্রা আজও অব্যাহত রয়েছে। সময়ের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা ও গ্রামের জীবনযাত্রার মান বদলেছে। কিন্তু রাংতা গ্রামের এই ছোট্ট পাঠশালায় প্রতিদিনই শোনা যায় শিশুদের কলকাকলি।

১৯৭৩ সালে চাঁদশী ঈশ্বর চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন রমণী কান্ত। এরপর সরকারি গৌরনদী কলেজে ভর্তি হলেও পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো সম্ভব হয়নি তার। মেধাবী হওয়ায় সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে সেই সুযোগ গ্রহণ না করে গ্রামের শিশুদের পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। শিশুদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই পাঠশালাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন তিনি।

রাজিহার-চাঁদশী সড়কের পাশে রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আঙিনায় তার এই পাঠশালা। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘রমণী কান্তের পাঠশালা’ নামে পরিচিত। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে পাঠদান।


এই পাঠশালায় শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাসিক বেতন নেই। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যেন অর্থের অভাবে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটিই রমণী কান্তের মূল লক্ষ্য। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তিনি বছরের পর বছর শিশুদের শিক্ষাদান করে যাচ্ছেন।

রমণী কান্তের ব্যক্তিগত জীবনও অত্যন্ত সাদামাটা। স্ত্রী রুম্পা বেপারীকে নিয়ে একটি দোচালা টিনের ঘরে বসবাস করেন তিনি। একমাত্র ছেলে তাপস বেপারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তার সামান্য কিছু কৃষিজমিও রয়েছে। অভাব-অনটনের মধ্যেও শিশুদের পড়ানোর আনন্দকেই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন এই শিক্ষক।

সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে রমণী কান্ত বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে বসে এলাকার শিশুদের পাঠদান করে আসছি। যত দিন বেঁচে আছি, এভাবেই শিশুদের মধ্যে শিক্ষা বিলিয়ে যেতে চাই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে যে সম্মাননা দিয়েছেন, তাতে আমার শিক্ষকজীবন সার্থক। বাকি জীবন মন্দির প্রাঙ্গণেই শিশুদের শিক্ষা দিয়ে কাটিয়ে দিতে চাই।

আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, রমণী কান্তের পাঠশালায় শিশু শিক্ষার্থীদের পাঠদান পদ্ধতি দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তার মতো ভালো মানুষ সমাজে আছেন বলেই দেশটা এত সুন্দর বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দীর্ঘ ছয় দশক ধরে বিনা মূল্যে শিশুদের শিক্ষাদান করে রমণী কান্ত বেপারী প্রমাণ করেছেন, শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, এটি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসারও নাম। তার ছোট্ট পাঠশালা তাই শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, গ্রামটির কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি ও শিক্ষার এক অনন্য আশ্রয়।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   ছয় দশক  বিনা মূল্যে পাঠদান  প্রধানমন্ত্রীর সম্মাননা  রমণী কান্ত  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: