জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সবচেয়ে বেশি খোঁজে আপনজনের সঙ্গ। একসময় যাদের ঘিরে ছিল সংসার, স্বপ্ন আর ব্যস্ততা, বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার পর অনেকের সেই মানুষগুলোই হয়ে ওঠেন দূরের। তখন পুরোনো দিনের স্মৃতিই হয়ে থাকে সঙ্গী।
বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকার একটি বৃদ্ধাশ্রমে এমনই নানা গল্প নিয়ে দিন কাটছে প্রায় ৭০ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার। তাদের একজন রুমা বেগম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট হওয়া এই নারী একসময় মেধা ও স্বপ্ন দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। অথচ জীবনের শেষবেলায় এসে তাঁর ঠিকানা হয়েছে আপনজনহীন এক বৃদ্ধাশ্রম।
বৃদ্ধাশ্রমে দীর্ঘ সময় নীরবে বসে থাকেন রুমা। নতুন সঙ্গীদের সঙ্গে কথা বলেন, মিশতে চেষ্টা করেন। কখনো পুরোনো দিনের গল্পও করেন। কিন্তু নিজের অতীতের কথা উঠলেই যেন থেমে যায় তার কণ্ঠ। একসময় যে সাফল্য তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল, জীবনের এই পর্যায়ে এসে সেই জীবনেই সবচেয়ে বড় শূন্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে আপন মানুষের অভাব।
রুমার মতোই এখানে দিন কাটছে আসমা, খাদেজা, অঞ্জলী, উষা রানী, বানু ও কহিনূর বেগমের। প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা হলেও কষ্টের জায়গাটা প্রায় একই—আপনজন থেকে দূরে সরে যাওয়া।
আসমার জীবনেও ছিল সংসার ও আপনজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষগুলো একে একে দূরে সরে গেছেন। এখন অন্যদের সঙ্গে গল্প করেই কাটে দিনের বড় একটা সময়। তবে সন্তানদের প্রসঙ্গ উঠলেই থেমে যান তিনি।
খাদেজা দীর্ঘ জীবন সন্তানদের জন্য কাটিয়েছেন। তাদের বড় করেছেন, সংসার সামলেছেন। অথচ শেষ বয়সে এসে সেই সন্তানদের কাছেই নিজেকে যেন বাড়তি একজন মানুষ মনে হয়েছে তাঁর। তাই ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে।
অঞ্জলী ও উষা রানীর জীবনেও রয়েছে বিচ্ছিন্নতার গল্প। কেউ দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে থেকেও একসময় আপন ঘর থেকে দূরে সরে গেছেন, কেউ ধীরে ধীরে হারিয়েছেন নিজের ঘরে নিজেরই থাকার অধিকার। বানু ও কহিনূর বেগমের দিনও কাটে একই ছাদের নিচে। কখনো গল্প করেন, কখনো হাসেন; আবার কখনো চুপচাপ বসে থাকেন। সেই নীরবতায় যেন জমে থাকে বহু না বলা কথা।
অঞ্জলী রানীর চাওয়াটাও খুব বেশি নয়। শেষ বয়সে সন্তানরা কাছে এসে কিছুক্ষণ বসুক, দুটো কথা বলুক—এটুকুই তার প্রত্যাশা। সারা জীবন যাদের জন্য করেছেন, তাদের কাছে এখন আর বড় কোনো চাওয়া নেই তার। শুধু চান, একবার যেন মনে হয়, তিনি এখনো তাদের প্রয়োজনের মানুষ।
বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সাখাওয়াত বলেন, এখানে থাকা প্রায় ৭০ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধার প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে কষ্টের গল্প। কেউ সন্তানদের অবহেলায় এখানে এসেছেন, কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তাদের অনেকেই এখনো স্বজনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় আছেন।
বয়সের ভারে শরীর যখন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসে, তখন বড় কোনো প্রাপ্তির চেয়ে কাছের একজন মানুষের সঙ্গই হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান। বরিশালের এই বৃদ্ধাশ্রমে রুমাদের জীবন যেন সেই সহজ সত্যেরই নীরব গল্প।
সময়ের আলো/জেডি