এক সপ্তাহ আগে শূন্য হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন-২৩। বিএনপির সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া এই আসনে কে আসছেন, তা নিয়ে দলটির ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের পরিবারের সদস্য, মহিলা দল ও ছাত্রদলের নেত্রী এবং রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরিদের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে দলের পক্ষ থেকে এখনও প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি।
সংসদের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি সময়ের আলোকে বলেন, নির্বাচন হলে একটি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে না, তাই খুব সম্ভবত মাসখানেকের মধ্যে এই প্রক্রিয়াটি শেষ হবে। যতদূর জানি দলে প্রার্থী এখনও চূড়ান্ত হয়নি। চূড়ান্ত হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনে তা জমা দেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সময়ের আলোকে বলেন, দলীয় ফোরামে বিষয়টি নিয়ে এখনও আলোচনা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। এর আগে মনোনয়ন বোর্ড আগ্রহীদের ডাকবে।
গত ১ অক্টোবর বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির আসন শূন্য ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। এতে বলা হয়, মিষ্টি পদত্যাগ করায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আসন-৩২৩ (মহিলা আসন-২৩) সংবিধানের ৬৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শূন্য হয়েছে। ওই দিন দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসের নাম রয়েছে। তিনি বর্তমানে মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান। যদিও এর আগে সময়ের আলোকে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘তিনি সংসদের সংরক্ষিত সদস্য হতে চান না।’
আলোচনায় রয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা সংস্থার অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান সিরাজের মেয়ে ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ (শুক্লা)। তবে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাঙ্গাইলের কালিহাতী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন তিনি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হারুনুর রশিদের স্ত্রী ও দলের সহ-মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা আশরাফী পাপিয়ার নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছে। নবম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সদস্য ছিলেন তিনি। সংসদে জোরালো বক্তব্যের জন্য সে সময় আলোচিত হন।
দলের সাংগঠনিক রাজনীতিতে সক্রিয় নারী নেত্রীদের মধ্যেও কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তারা হলেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভর সম্পাদক আসমা আজিজ, ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা দলের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট রুনা লায়লা এবং ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক রেহানা আক্তার শিরিন।
রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফরের মেয়ে জয়া কাজীর নামও রয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন চেয়ে আবেদন করে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তিনি। জোটসঙ্গীদের মধ্যেও আলোচনা রয়েছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল— জেএসডির সহ-সভাপতি ও আ স ম আবদুর রবের স্ত্রী তানিয়া রবের নামও আলোচনায় এসেছে।
এর আগে ত্রয়োদশ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পেতে বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা, দিলরুবা খান, রিজিয়া পারভীন, দিঠি আনোয়ার ও রিনা খানসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের কয়েকজন তারকা সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। শেষ মুহূর্তে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন ছোটপর্দার অভিনেত্রী রুকাইয়া জাহান চমক। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের কেউ মনোনয়ন পাননি।
রাজনীতির বাইরে থাকা পেশাজীবী, সংস্কৃতিকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের এবার মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা। তাদের মতে, সরকারের সাত মাসের মাথায় একটি বিশেষ নেতিবাচক কারণে আসনটি শূন্য হয়েছে। তাই দলের চেয়ারম্যান নিজে যাচাই-বাছাই করে প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন।
মিষ্টির পদত্যাগের পেছনে রয়েছে মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনা। গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে প্রায় ২০০ ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা চালায়। তারা একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। পাকা ভবনের কয়েকটি কক্ষের জানালা-দরজাও ভাঙচুর করা হয়।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আসবাব, ওষুধ, আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’র সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। ঘটনার পর স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম আসে। শাহআলী থানায় করা মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত বলে জানা যায়।
রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় মিষ্টির নাম আসার পর বিষয়টি বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে গুরুত্ব পায়। তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসার পর রাজনৈতিক দায় ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে