সপ্তাহের শেষ দিকে টানা দুদিন সূচকে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও দেশের শেয়ারবাজারের সামগ্রিক দুর্বলতা কাটেনি। সপ্তাহজুড়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম— দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরে পতন হয়েছে। প্রধান সূচকের পতনের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানির সূচকে তুলনামূলক বড় ধাক্কা লেগেছে। ফলে শেষ দিকে সূচকের ঘুরে দাঁড়ানোয় কিছুটা স্বস্তি মিললেও বাজারে স্থিতিশীলতার আভাস এখনও স্পষ্ট নয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাপ্তাহিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সপ্তাহ শেষে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৭৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে। আগের সপ্তাহের তুলনায় সূচকটি কমেছে ১ দশমিক ০১ শতাংশ। অন্যদিকে বাছাই করা ৩০টি বড় কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস৩০ সূচক সামান্য বেড়ে ২ হাজার ১০৫ দশমিক ৬৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানির সূচক ডিএসইএস কমেছে ১ দশমিক ২১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি চাপ দেখা গেছে ছোট ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানির সূচকে। ডিএসএমইএক্স কমেছে ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
সূচকের এই চিত্রের সঙ্গে বাজারে দরবৃদ্ধি ও দরপতনের ব্যবধানও সামগ্রিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে ২৯০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। বিপরীতে দাম বেড়েছে মাত্র ৮১টির। অপরিবর্তিত ছিল ১৪টির দর। অর্থাৎ প্রধান সূচকের পতন তুলনামূলক সীমিত থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীরা দরপতনের মুখে পড়েছেন।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। সপ্তাহে সেখানে ২২০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। দাম বেড়েছে ৬৩টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ১৪টির। দুই বাজারেই দরপতনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি থাকায় শেষ দিকের সূচক বৃদ্ধিকে বাজারের পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
লেনদেনের পরিমাণ অবশ্য বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের একটি চিত্র তুলে ধরেছে। ডিএসইতে সপ্তাহজুড়ে মোট লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৭৮২ কোটি টাকার বেশি। দৈনিক গড় লেনদেন ছিল প্রায় ৫৫৬ কোটি টাকা। তবে লেনদেনের পরিমাণ থাকলেই বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এমনটি বলা যায় না। কারণ লেনদেনের পাশাপাশি কতটি প্রতিষ্ঠানের দর বেড়েছে বা কমেছে, সেটিও বাজারের গতিপ্রকৃতি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে সপ্তাহ শেষে উভয় শেয়ারবাজারই হারিয়েছে মূলধন।
গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে (০১ অক্টোবর) যেখানে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা, সেখানে গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে বাজার মূলধন নেমে এসেছে ৬ লাখ ৮৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক সপ্তাহেই ডিএসই বাজার মূলধন হারিয়েছে ১ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। অপরদিকে সিএসইতে গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে যেখানে বাজার মূলধন ছিল ১৩৮ কোটি টাকা, সেটি গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে মাত্র ৭৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ এই বাজারটি সপ্তাহান্তে মূলধন হারিয়েছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা।
সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ১১ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট বেড়েছে। কিন্তু শুধু সূচকের এই বৃদ্ধি দিয়ে বাজারের দুর্বলতা কাটার প্রমাণ পাওয়া যায় না। শেষ দিনের লেনদেনের পরিমাণ আগের দিনের তুলনায় কমে থাকাও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। সূচকের এই সাময়িক উত্থান নতুন ক্রয়চাপের ফল, নাকি নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারের দরবৃদ্ধির প্রভাব— তা বুঝতে পরবর্তী কার্যদিবসগুলোর লেনদেন ও দরপরিবর্তন পর্যবেক্ষণ জরুরি বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সপ্তাহজুড়ে কিছু শেয়ারে বড় দরবৃদ্ধি দেখা গেলেও তা বাজারের সার্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ডিএসইতে এপেক্স ফুডসের শেয়ারের দাম বেড়েছে ২৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ল্যাম্পসের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ এবং আজিজ পাইপসের বেড়েছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। সিএসইতেও এপেক্স ফুডসের শেয়ারের দাম প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে।
অন্যদিকে দরপতনের তালিকায় ছিল কয়েকটি মিউচুয়াল ফান্ড ও কোম্পানি। ডিএসইতে ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের দাম কমেছে ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। সিএসইতে তহবিলটির দরপতন ছিল ২২ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই বাজারে সাইফ পাওয়ারটেকের শেয়ারের দাম কমেছে ২১ দশমিক ৫১ শতাংশ। একই সময়ে কিছু শেয়ারের বড় দরবৃদ্ধি এবং অন্যগুলোর বড় দরপতন বাজারে বিনিয়োগকারীদের অভিন্ন প্রবণতার বদলে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ভিন্ন আচরণের ইঙ্গিত দেয়।
সিএসইতে সপ্তাহজুড়ে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। শ্রেণিভিত্তিক লেনদেনে ‘এ’ শ্রেণির কোম্পানির অংশ ছিল ৭৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ‘জেড’ শ্রেণির কোম্পানির অংশ ছিল ১২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তবে কোনো শ্রেণিতে লেনদেনের অংশ বেশি হলেই সেই শ্রেণির শেয়ারগুলোর মৌলভিত্তি বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
বাজারের এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সূচকের স্বল্পমেয়াদি উত্থানকে বাজারের স্থায়ী পুনরুদ্ধার ধরে নেওয়ার আগে দরবৃদ্ধিকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, লেনদেনের ধারাবাহিকতা এবং কোম্পানির আর্থিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধি ও দরপতনের পেছনে নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ঘোষণা, আর্থিক প্রতিবেদন এবং বাজারসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে তারা মনে করছেন, বিগত সপ্তাহের শেষ দিকে সূচকের ঘুরে দাঁড়ানো বাজারে কিছুটা ইতিবাচক সংকেত দিলেও অধিকাংশ শেয়ারের দরপতন এবং ছোট ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানির সূচকের বড় পতন দুর্বলতার চিত্রই তুলে ধরছে। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে সূচকের এক-দুই দিনের বৃদ্ধি নয়, বরং ধারাবাহিক দরবৃদ্ধি ও বিস্তৃত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে