সাংস্কৃতিক রূপান্তর : আমরা কোন পথে হাঁটছি?

ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস

মতামত

সমাজ পরিমণ্ডলে মানুষ বিচিত্র প্রাণী হিসেবে সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নানা পরিচয়ে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে থাকে। সামাজিক প্রপঞ্চের অনুষঙ্গগুলো এখানে

2026-10-11T03:57:45+00:00
2026-10-11T03:57:45+00:00
 
  রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬,
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
সাংস্কৃতিক রূপান্তর : আমরা কোন পথে হাঁটছি?
ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস
প্রকাশ: রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৫৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
সমাজ পরিমণ্ডলে মানুষ বিচিত্র প্রাণী হিসেবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নানা পরিচয়ে বিভিন্ন ভূমিকা পালন করে থাকে। সামাজিক প্রপঞ্চের অনুষঙ্গগুলো এখানে নিয়ামক হিসেবে জ্বালানি জোগায়। এগুলো সামাজিক, মানবিক ও বৈশ্বিক মনমানসিকতা, সম্প্রীতি এবং ভালোবাসার সম্মিলন ঘটাতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। এসব উপাদানের যৌক্তিক বিকাশের মধ্যেই সৌন্দর্য নিহিত। সামাজিক, পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ে এসবের চর্চা বেশ জরুরি। সাংস্কৃতিক ঘরানার শক্তিমান উৎকর্ষই বলে দেয়, সমাজ ও সম্প্রদায়ের যাত্রা কতটা স্বাভাবিক। 

মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনমানের অনুশীলন ও পরিচর্যার সার্থক রূপায়ণই নির্ধারণ করে গন্তব্য কোন দিকে। কেননা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার চর্চার মধ্য দিয়েই নৈতিকতা, মানবিকতা, আইনকানুন, মূল্যবোধ, আদর্শ, সামাজিক বন্ধন, শ্রদ্ধা, স্নেহ ও ঐতিহ্য চর্চিত হয়। ট্যালকট পারসন্সের সংস্কৃতিবিষয়ক বিশ্লেষণে বিষয়টি ফুটে উঠেছে— ‘সংস্কৃতি হলো মূল্যবোধ, আদর্শ ও প্রতীকগুলোর এমন এক ব্যবস্থা, যা সামাজিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালিত করে।’ প্রশ্ন হলো, হালজামানায় সাংস্কৃতিক অনুশীলন ও রূপান্তর আমাদের কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে? এসব কি অগ্রগতি, নাকি বিচ্যুতির নির্দেশক? ভাবার বিষয়। সাম্য, সমতা, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার স্থিতিশীল পরিবেশ নির্মাণে এসবের জুড়ি মেলা ভার!

জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি মানুষ সামাজিকীকরণের মাধ্যমে শাণিত ও প্রস্ফুটিত হয়। এ যাত্রায় সাংস্কৃতিক রূপান্তর বিরাট প্রভাব ফেলে। পরিবার হলো সেই প্রাথমিক বাহন, যেখানে মানুষের সাংস্কৃতিক জগতের ভিত্তি রচিত হয়। এখানে বিচ্যুতি ঘটলে এর প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার, এমনকি সমাজ ও রাষ্ট্রকেও বহন করতে হয়। আচার-আচরণ, আদব-কায়দা, রুচি, অভ্যাস, নীতি-নৈতিকতা, ভোগ ও ত্যাগ, সহানুভূতি, সমানুভূতি, দায়িত্ব-কর্তব্য, জবাবদিহি এবং নাগরিক গুণাবলির অভ্যাস পারিবারিক পরিমণ্ডলেই গড়ে ওঠে। এসবের বিপর্যয় সাংস্কৃতিক দীনতার প্রকাশ ঘটায়। সময়ের পরিক্রমায় কর্মব্যস্ততা ও বৈশ্বিক যোগাযোগের প্রভাবে সাংস্কৃতিক চর্চার ধরনেও পরিবর্তন দেখা যায়। তবে তা সবসময় ইতিবাচকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাঝেমধ্যে ঐতিহ্যগত প্রথা, আচরণ, কৃষ্টি ও মনোভাবকেও বিপথে পরিচালিত করে। এমন রূপান্তর সমাজ ও সংস্কৃতিতে অস্থিরতা তৈরি করে।

স্থানিক জীবনধারায় ইদানীং কী দেখছি? আভিজাত্যের রঙিন ফানুস! বাড়ি, গাড়ি, ফ্যাশন ও অর্থবৈভব নিয়ে অহেতুক বড়াই। কোথায় যেন এক শূন্যতা! অথচ এসবের সাবলীল চর্চার মধ্যেই আনন্দ নিহিত থাকার কথা। নতুন জামানায় শিল্পায়ন ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রভাবে এসবের সঙ্গে অহমিকা ও লোভের সংযোগ অহরহ দেখা যায়। ফলে সমাজের চিরায়ত প্রথা ও মূল্যবোধ ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, স্নেহ ও মানবিকতা লোপ পেয়ে সমাজ যেন বিপরীত দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর ফলে একাকিত্ব ও বিষণ্নতার দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হচ্ছে। ‘আমরা’ বদলে ‘আমি’ প্রবণতা বাড়ছে। সমাজ-সংস্কৃতির এমন রূপান্তর নেতিবাচকতাকেই স্বাগত জানাচ্ছে, যা বাসযোগ্য সমাজের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সাংস্কৃতিক রূপান্তর সমাজ-সংসারে নানা সংকট তৈরি করছে। মর্যাদা ও ভূমিকা সম্পর্কে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনোভাব এসবের অন্যতম কারণ। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করতে অনীহা, নিজেকে বড় করে উপস্থাপন, অসততা ও দুর্নীতি— এসব যেন জেঁকে বসেছে। ফলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা পাগলা ঘোড়ার মতো ছড়িয়ে পড়ছে। ইদানীং ধর্ষণ, বলাৎকার, খুনখারাবি, ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির প্রবণতা বাড়ছে। বকধার্মিকতা, সত্যকে অস্বীকার করা, লাভ ও লোভে নিমজ্জিত থাকা এবং অন্যের মতপ্রকাশে অযাচিতভাবে বাধা সৃষ্টি করার প্রবণতাও বাড়ছে। দুর্জন বিদ্বানেরা নিজেদের স্বঘোষিত মানসিক রোগীর তকমায় জড়াতে কেন যেন দ্বিধা করছেন না! ইদানীং এসব জ্ঞানপাপীর আস্ফালন, চারিত্রিক শঠতা ও পাণ্ডিত্যের অহমিকা মূলত সাংস্কৃতিক অবক্ষয়কেই ইঙ্গিত করে। এমন রূপান্তর কি আমাদের কাম্য ছিল? ছত্রিশে জুলাইয়ের বিপ্লবপরবর্তী রাষ্ট্র মেরামতের আকাঙ্ক্ষার বীজ বপন করা হয়েছিল। একবারও কি তা ভেবেছি?

আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ। কী ছিল না আমাদের? যৌক্তিক কারণেই ব্রিটিশরা রুটি-রুজির তাগিদে এ দেশে এসেছিল। তখনকার বাংলা বেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। সাম্প্রতিক অতীতেও এ জনপদে মানুষে মানুষে মমত্ববোধ ছিল চোখে পড়ার মতো। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, নীতি-নৈতিকতা, বিনিময়প্রথা, প্রতিবেশীর সঙ্গে মেলবন্ধন, প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ, আত্মীয়তার বন্ধন, সংকটে পাশে থাকার মানসিকতা, রোগীর সেবা, যূথবদ্ধ মনোভাব এবং সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে সবার সাগ্রহ উপস্থিতি— এসব ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। আর আজ এসব যেন দূর অতীতের গল্প। কেন এমন হলো? আধুনিকতা, আভিজাত্য ও আমিত্ববোধ কি এসবের ওপর আঘাত হেনেছে? আজ কেবল চাওয়া-পাওয়ার আক্ষেপ! কোথাও দুদণ্ড স্বস্তি নেই। সর্বত্রই হাহাকার! শিশুর খেলার সাথি নেই, প্রতিবেশীর সঙ্গে সখ্য নেই, চলাফেরায় নিরাপত্তা নেই, কন্যাশিশুরা লালসার শিকার হচ্ছে, ভেজালে সয়লাব চারপাশ, শিশুখাদ্য অনিরাপদ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার অনুভূতি ফিকে হয়ে আসছে এবং বিয়েবিচ্ছেদের অস্বাভাবিক প্রবণতা যেন রোজকার চর্চায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু কেন?

ইদানীং এসবের পেছনে কেন ছুটছি আমরা? আমাদের ভোগবাদী মনোভাব কি হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে? সবার যেন একটাই আরাধনা— বড় হতে হবে। সমাজের সব স্তরেই এ প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী! এসব আসক্তি কি কেবল আত্মকেন্দ্রিক মনোবৃত্তির প্রকাশ, নাকি সাংস্কৃতিক বৈকল্য? ফলে তহবিলের প্রহরী থেকে খানসামা— সবাই এ অশুভ প্রতিযোগিতায় মত্ত। যেখানে শিক্ষার মাধ্যমে মানবিকতার বিকাশ ঘটার কথা, সেখানে উচ্চশিক্ষিত সমাজের ভাষাজ্ঞানের লাঠিয়ালি মনোভাবে স্বজাতি ও সহকর্মীরা অনিরাপদ বোধ করেন। 

ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে ভোক্তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। চাষিরা অধিক মুনাফার লোভে ফসলে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশাতেও বিব্রত হচ্ছেন না। সড়ক পরিবহন সিন্ডিকেটের দাপটে যাত্রী ও ভোক্তাদের ওপর চাপছে অতিরিক্ত খরচের বোঝা। অবকাঠামো ও উন্নয়নকাজে অনিয়ম, লাগামহীন দুর্নীতি এবং অসংগতি যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বিদেশে মানবপাচার ও অর্থপাচার যেন মজ্জাগত সাংস্কৃতিক রূপান্তরেরই প্রতিফলন! তদবির-বাণিজ্য, প্রশাসনিক দাপট, লেজুড়বৃত্তিক মনোবৃত্তি, তেলবাজি ও স্বজনপ্রীতির মতো সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ অক্টোপাসের মতো বিস্তৃত হচ্ছে।

এসব কীসের আলামত? আমরা কি ভুল পথে হাঁটছি? সাংস্কৃতিক হীনম্মন্যতা ও দৈন্য আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। আমাদের সংগ্রাম, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সাফল্য, এত প্রাণের বলিদান, ক্ষয়ক্ষতি ও আশা-আকাঙ্ক্ষার মূলে শাবল চালাচ্ছে এই অবক্ষয়। আর কত রক্তের প্রয়োজন আমাদের সম্বিত ফিরতে? আমাদের মধ্যে কি জাতীয়তাবোধ ও চেতনা জাগবে না?

সময় এখনই শিকড়কে শক্ত করার। এ দেশ সোনার বাংলা; কেবল জাগিয়ে তুলতে হবে নৈতিকতাকে। সাংস্কৃতিক রূপান্তরের এই পর্যায়ে আমাদের প্রয়োজন ভালো মানুষ। মানুষকে যদি প্রকৃত অর্থে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তা হলে অনেক ‘যদি-কিন্তু’রই সুরাহা হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও
  বিষয়:   সাংস্কৃতিক রূপান্তর  হাঁটছি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: