ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র— এমন হুমকির কথা বিবেচনায় নিয়ে অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠন করছে তেহরান। এর মধ্যেই ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে রাশিয়া। এ বিষয়ে অবগত পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাতে গত শুক্রবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্লুমবার্গ।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের টানা কয়েক মাসের বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে পেরেছে এবং অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ধরে রেখেছে। পশ্চিমা এক কর্মকর্তা জানান, ইরানের কাছে এখনো বিপুল পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও কিছু জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। দেশটি দ্রুত এসব অস্ত্রের উৎপাদন বাড়াতেও সক্ষম।
ওই কর্মকর্তা আরও নিশ্চিত করেন, রাশিয়া তেহরানকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে। এতে গত জুনে করা পৃথক একটি গোয়েন্দা মূল্যায়নের তথ্যের সত্যতা আবারও সামনে এসেছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্লুমবার্গ। তবে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ব্লুমবার্গের এই প্রতিবেদন মার্কিন প্রশাসনের সেই দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, যেখানে বলা হয়েছিল, আট মাসের টানা বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন যদি পুনরায় হামলা শুরু করে, তাহলে ইরানের এখনো পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
এদিকে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালির কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা জোরদার করেছে এবং গত সপ্তাহে অন্তত ১০টি জাহাজে আঘাত হেনেছে। হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন এ বিষয়ে ব্লুমবার্গের মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক বিশ্লেষক এবং বর্তমানে কিংস কলেজ লন্ডনের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো জিম ল্যামসন জানান, মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরাইলের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের কাছে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। তবে বর্তমানে এর কতগুলো অবশিষ্ট রয়েছে, তা অজানা। গত জুনের পশ্চিমা গোয়েন্দা মূল্যায়নে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, যুদ্ধের আগে থাকা গোলাবারুদের প্রায় ৭৫ শতাংশই ধরে রাখতে পেরেছে তেহরান।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান ৪ হাজারটিরও বেশি ‘শাহেদ’ ড্রোন এবং অন্তত ২ হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের প্রতিরক্ষা গবেষণাপ্রধান বেকা ওয়াসার সতর্ক করে বলেন, মার্কিন হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত থাকায় তেহরান পরবর্তী দফার লড়াইয়ের জন্য নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ পাচ্ছে। ফলে কোনো পক্ষই স্পষ্ট প্রাধান্য না পাওয়ায় এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের ঠিক আগেই শুক্রবার রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার একটি চুক্তির ঘোষণা আসে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়া ও দাম বৃদ্ধি রোধে বিশ্ববাজারে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়। ওই সমঝোতার অংশ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার জ্বালানির ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নিয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর আয়ের পথ বন্ধ করতে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এরপর ওয়াশিংটনের সর্বশেষ এই পদক্ষেপকে ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে রাশিয়ার ওপর কয়েক বছর ধরে বজায় রাখা মার্কিন চাপের এক অভাবনীয় ও চাঞ্চল্যকর বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে গত মাসে প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সাল থেকে রাশিয়া গোপনে ইরানকে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করে আসছে। রাশিয়ার প্রকৌশলীরা তেহরানকে একটি র্যামজেট প্রপালশন সিস্টেম তৈরিতে সাহায্য করছেন, যা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য নৌ সরঞ্জামের বিরুদ্ধে নতুন হুমকি তৈরির সক্ষমতা দেবে ইরানকে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ