একটি ছোট্ট ব্যাঙের অস্তিত্ব রক্ষায় থেমে গেছে সড়ক নির্মাণের কাজ। ইকুয়েডরের পাহাড়ি এলাকায় বিরল এই প্রাণীটির পক্ষে আদালতে লড়ছেন আইনজীবীরা। একদিকে দুর্গম এলাকার মানুষের যাতায়াত, চিকিৎসা ও ব্যবসার সুবিধার জন্য সড়কটি প্রশস্ত করা জরুরি।
অন্যদিকে সেই সড়ক নির্মাণের কারণে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে পারে ব্যাঙটির পুরো প্রজাতি। তাই প্রশ্ন উঠেছে— মানুষের উন্নয়নের প্রয়োজনে কি একটি প্রাণীর বিলুপ্তির ঝুঁকি মেনে নেওয়া যায়? ইকুয়েডরের সংবিধানে প্রকৃতিরও বেঁচে থাকার অধিকার স্বীকৃত। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই এখন একটি ছোট্ট ব্যাঙকে ঘিরেই।
ব্যাঙটির নাম জামবাটো হারলেকুইন। এর পিঠ কালচে, আর পেটের অংশ উজ্জ্বল কমলা-হলুদ। একসময় ইকুয়েডরের বিভিন্ন এলাকায় এই ব্যাঙ দেখা যেত। কিন্তু উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়া এবং ছত্রাকজনিত সংক্রমণের কারণে এর সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। ১৯৮৮ সালের পর ব্যাঙটির আর দেখা না মেলায় বিজ্ঞানীরা একসময় একে বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত বলে মনে করেছিলেন।
২০১৬ সালে আঙ্গামারকা এলাকার এক ১২ বছর বয়সি ছেলে আবার একটি জামবাটো ব্যাঙ খুঁজে পায়। এতে নতুন করে আশার আলো দেখেন বিজ্ঞানীরা। ২০২১ ও ২০২২ সালে ওই এলাকায় জরিপ চালিয়ে গবেষকরা ৭১টি ব্যাঙের সন্ধান পান। বর্তমানে সংরক্ষণকর্মীদের অনুমান, বিশ্বে এ প্রজাতির মাত্র ৯২ থেকে ৩৫৯টি ব্যাঙ টিকে আছে।
ব্যাঙের আবাসস্থলের ওপরে সড়ক : ইকুয়েডরের আন্দিজ পর্বতমালার আঙ্গামারকা উপত্যকায় প্রায় সাত হাজার মানুষের বসবাস। এলাকার মানুষের জন্য বাইরের শহরে যাতায়াতের প্রধান পথ একটি সরু সড়ক। কৃষকরা এই পথে তাদের পণ্য বাজারে নেন। অসুস্থ মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ২০২৪ সালে স্থানীয় সরকার সড়কটি প্রশস্ত করার প্রকল্প অনুমোদন করে।
কিন্তু সড়কটির একটি অংশ জামবাটো ব্যাঙের শেষ পরিচিত আবাসস্থলের মধ্য দিয়ে গেছে। নির্মাণকাজে পাহাড়ের পাথর ভাঙতে বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। এতে ভাঙা পাথর ও মাটি আশপাশের পরিবেশ এবং নদীতে পড়তে থাকে। সংরক্ষণকর্মীদের আশঙ্কা, যথাযথ পরিবেশগত সুরক্ষা ছাড়া কাজ চললে ব্যাঙটির আবাসস্থল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ব্যাঙটি রক্ষায় ২০২১ সালে বিজ্ঞানী, পরিবেশকর্মী, স্থানীয় আদিবাসী নেতা ও স্বেচ্ছাসেবীরা ‘আলিয়াঞ্জা জামবাটো’ নামে একটি উদ্যোগ গড়ে তোলেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তারা সেডেনমা নামের পরিবেশ সংরক্ষণ সংগঠনগুলোর জোটের সহযোগিতায় আদালতে আবেদন করেন। তাদের দাবি, সড়ক নির্মাণে ব্যাঙটির অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ছে।
সংবিধানে প্রকৃতির অধিকার : ইকুয়েডরের সংবিধানে ২০০৮ সাল থেকে প্রকৃতির অধিকার স্বীকৃত। এর অর্থ প্রকৃতিকে শুধু মানুষের ব্যবহারের সম্পদ হিসেবে দেখা যাবে না; তার অস্তিত্ব ও স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকার অধিকারও রক্ষা করতে হবে। কোনো কর্মকাণ্ডের ফলে প্রজাতির বিলুপ্তি বা বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংসের আশঙ্কা থাকলে তা ঠেকানোর দায়িত্বও সরকারের রয়েছে। এই আইনি ব্যবস্থার ভিত্তিতেই ব্যাঙটির পক্ষে মামলা হয়েছে। আইনজীবী গুস্তাভো রেদিন বলেছেন, তিনি ব্যাঙটির আইনজীবী— ব্যাঙটিই তার মক্কেল।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্থানীয় আদালত পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে যথাযথ তথ্য দেওয়ার আগপর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। পরে এক প্রতিবেদনে নির্মাণের মাটি-পাথর ছড়িয়ে পড়ার কথা উঠে এলেও জরিপকারীরা ব্যাঙটির সন্ধান পাননি। বিরল প্রাণীটি খুঁজে পাওয়া কঠিন বলে জানান সংরক্ষণকর্মীরা। ফেব্রুয়ারিতে উচ্চতর আদালত ব্যাঙটির সুরক্ষায় আইনি পদক্ষেপ মঞ্জুর করেন। নির্মাণকাজ থেমে গেলেও তত দিনে তার আবাসস্থলের মধ্য দিয়ে সড়কের বড় একটি অংশ তৈরি হয়ে গেছে।
উন্নয়ন নাকি প্রাণীর অস্তিত্ব : স্থানীয় মানুষের জন্য সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ— এ কথা সংরক্ষণকর্মীরাও অস্বীকার করছেন না। তাদের দাবি, উন্নয়ন বন্ধ করা নয়, বরং পরিবেশগত ক্ষতি এড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য, অন্য পথে সড়ক নেওয়া ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন।
এ কারণে জামবাটো ব্যাঙের মামলা শুধু একটি প্রজাতি রক্ষার বিষয় নয়; এটি মানুষের প্রয়োজন ও প্রকৃতির অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার পরীক্ষাও। সাধারণত পরিবেশ রক্ষার মামলায় মানুষের স্বাস্থ্য, পানীয় জল বা জীবিকার ক্ষতির বিষয় সামনে আসে। এখানে সড়কটি স্থানীয় মানুষের উপকারে এলেও তার নির্মাণ ব্যাঙটির বিলুপ্তির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আগামী ১২ অক্টোবর মামলার পরবর্তী আপিলের শুনানি হওয়ার কথা। তবে ব্যাঙটির বর্তমান সংখ্যা নিশ্চিত নয়। নিয়মিত জরিপ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আদালতের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রাণীটির নিরাপদ আবাসস্থল রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সমন্বয় জরুরি।
একটি ছোট্ট ব্যাঙের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে এই লড়াই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে— প্রকৃতির অধিকার আইনে স্বীকৃত হলে, কোনো প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে পড়লে তার দায় কে নেবে? মানুষের উন্নয়ন ও প্রকৃতির অস্তিত্ব কি পাশাপাশি টিকে থাকতে পারে? ইকুয়েডরের এই মামলা সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে