জাতীয় কন্যাশিশু দিবস : ঝুঁকিতে কন্যাশিশুর সুরক্ষা

রতন মালো

মতামত

কন্যাশিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত কে করবে? এটি একটি বড় প্রশ্ন। সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নাকি অভিভাবক, প্রতিবেশী, নাকি অন্য

2026-10-12T06:16:16+00:00
2026-10-12T06:16:16+00:00
 
  সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬,
২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
জাতীয় কন্যাশিশু দিবস : ঝুঁকিতে কন্যাশিশুর সুরক্ষা
রতন মালো
প্রকাশ: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১৬ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
কন্যাশিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত কে করবে? এটি একটি বড় প্রশ্ন। সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নাকি অভিভাবক, প্রতিবেশী, নাকি অন্য কেউ? কন্যাশিশুর সরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব আসলে সবার। কন্যাশিশুকে শুধু বাইরে যেতে নিষেধ করা নয়। তাকে নিরাপদে কথা বলার পরিবেশ দেওয়া, অনলাইন ও অফলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা, বিপদের সময়ে দোষারোপ না করে তার পাশে দাঁড়ানো জরুরি।

কন্যাশিশুদের ঘিরে বাংলাদেশে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে। স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপত্তা, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, বাল্যবিয়ে— এসব পুরোনো উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্রতারণা, যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট, ডিজিটাল প্রতারণা, পাচার, নিখোঁজ হওয়ার মতো নতুন নতুন ঝুঁকি। কন্যাশিশুর সুরক্ষা এখন শুধু দরিদ্র বা প্রান্তিক পরিবারের সমস্যা নয়। ডিজিটাল যুগে এটি এখন মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারেরও উদ্বেগের বিষয়।

প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ১১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। বাংলাদেশ সরকার ‘জাতীয় কন্যাশিশু দিবস ২০২৬’ উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১২ অক্টোবর।

ইউনিসেফের চাইল্ড প্রটেকশন স্ট্র্যাটেজি ২০২১-৩০ অনুযায়ী শিশু সুরক্ষা হলো— ‘শিশুদের প্রতি শোষণ, নির্যাতন, অবহেলা, ক্ষতিকর প্রথা ও সহিংসতা প্রতিরোধ এবং এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।’ শিশুদের ওপর সহিংসতা বাড়ি, স্কুল, কমিউনিটি এবং অনলাইন— সব জায়গাতেই ঘটতে পারে এবং অনেক সময় শিশুর পরিচিত ও বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিরাই অপরাধী হতে পারে।

কন্যাশিশুর সুরক্ষা বিষয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ২০২৫ সালের সংবাদপত্রভিত্তিক পর্যবেক্ষণে এক ভয়াবহ বাস্তবতার চিত্র সামনে এনেছে। ২০২৫ সালে সংগঠনটি ৭৮৬ জন নারী ও কন্যাশিশুকে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হিসেবে নথিভুক্ত করে। এর মধ্যে ৫৪৩ জনই ছিল ১৮ বছরের নিচে। একই প্রতিবেদনে কন্যাশিশুদের মধ্যে ১৪২টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা, ২০৩টি আত্মহত্যা এবং ১১৭টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়।

চলতি বছরে পরিস্থিতি আর নাজুক। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী প্রথম ৮ মাসেই মোট ১,৯১৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে নারী ও কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে। এর মধ্যে ৮৮৪টি ঘটনায় ভুক্তভোগী কন্যাশিশু। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৩১টি ধর্ষণের ঘটনায় ২৪০ জন ছিল কন্যাশিশু; ধর্ষণের পর হত্যার ৩৩টি ঘটনার মধ্যে ২২ জন ছিল কন্যাশিশু। ১৩৬টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় ১১২ জন ভুক্তভোগী ছিল কন্যাশিশু।

বাংলাদেশে কন্যাশিশুর সুরক্ষা সংকটের একটি আশঙ্কার দিক হলো— শিশুর জন্য নিরাপদ বিবেচিত স্থানগুলোও নিরাপদ নয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশ ২০২৫ সালের মার্চে দেশের শিশুদের ওপর, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ২০২৬ সালের মে মাসেও সংস্থাটি শিশু ধর্ষণ, হত্যাসহ সহিংসতার ঘটনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।

ইউনিসেফ বলেছে, শিশুদের নিরাপত্তার জন্য পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, প্রতিবেশী এবং সেবাকেন্দ্রসহ সব জায়গায় সুরক্ষাব্যবস্থা ও জবাবদিহি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। অর্থাৎ কন্যাশিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নটি কেবল রাস্তাঘাট বা অপরিচিত ব্যক্তির ঝুঁকিতে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত ব্যক্তি, সামাজিক সম্পর্ক এবং এমনকি শিশু যে পরিবেশে আস্থার সঙ্গে যায়, সেখানেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী মানব পাচারের ওপর ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন (টিআইপি)’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে পরপর তিন বছরের টিআইপি প্রতিবেদন বলছে ‘বাংলাদেশে শিশু যৌন পাচার এখনও ব্যাপক আকারে বিদ্যমান, ধারণা করা হয় প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে।’

প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, পাচারকারীরা চাকরি বা আয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারী ও কন্যাশিশুদের প্রলুব্ধ করে এবং বাণিজ্যিক যৌন শোষণের দিকে ঠেলে দেয়। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের ‘স্টপিং দ্য ট্রাফিক’ প্রতিবেদনে দারিদ্র্য, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, বাল্যবিয়ে, সামাজিক বৈষম্য ও দুর্বল সুরক্ষাব্যবস্থা পাচারের ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

ইউনিসেফ বাংলাদেশ ২০২৫ সালে একটি ১১ বছর বয়সি মেয়ের ঘটনা তুলে ধরেছিল, যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের পর নিখোঁজ হয়েছিল এবং পরে বাড়ি থেকে অনেক দূরে উদ্ধার হয়।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক চারটি বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির ৪৫৬ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৩.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জীবনের কোনো পর্যায়ে অন্তত এক ধরনের অনলাইন যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, গবেষণায় শহরের শিশুদের অনলাইন যৌন নিপীড়নের ঝুঁকি গ্রামীণ শিশুদের তুলনায় বেশি পাওয়া গেছে।

অনলাইনে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা ঝুঁকির ক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারের শিশুর চেয়ে মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারের অভিভাবকদের উদ্বেগের জায়গাটি বেশি। দামি স্মার্টফোন, ভালো স্কুলে পড়াশোনা যেখানে সবার হাতে দামি মোবাইল কন্যাশিশুর সুরক্ষার পরিবর্তে তার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল পরিবারের কন্যাশিশুরা কিন্তু এ ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশে ২০২৫ সালে একটি যুব জরিপ পরিচালনা করে। সেটিতে প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণ-তরুণী অংশগ্রহণ করে। জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ অংশগ্রহণকারী জানান— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া সংবাদ, ভুল তথ্য তাদের মানসিক চাপের কারণ হয়েছে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও দেখা প্রয়োজন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক নতুন গবেষণায় ২১টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি প্রায় প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন এক বছরের মধ্যে প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত কোনো না কোনো ধরনের যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

ইউনিসেফের তথ্য আরও বলছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬৫ কোটি নারী ও কন্যাশিশু শৈশবকালে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন— যা প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন। তাদের মধ্যে ৩৭ কোটিরও বেশি নারী ও কন্যাশিশু শৈশবকালে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

২০২৬ সালে বাংলাদেশে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে নতুন আইন হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ সালে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি বা অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত যৌন ছবি বা ভিডিও প্রকাশ এবং যৌন কনটেন্ট ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল সংক্রান্ত অপরাধের বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আইনি কাঠামোও নতুন ঝুঁকির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু আইন থাকা এবং কন্যাশিশুর বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার বাস্তবতায় তফাত দেখা যাচ্ছে।

কন্যাশিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত কে করবে? এটি একটি বড় প্রশ্ন। সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নাকি অভিভাবক, প্রতিবেশী, নাকি অন্য কেউ? কন্যাশিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব আসলে সবার। কন্যাশিশুকে শুধু বাইরে যেতে নিষেধ করা নয়। তাকে নিরাপদে কথা বলার পরিবেশ দেওয়া, অনলাইন ও অফলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা, বিপদের সময়ে দোষারোপ না করে তার পাশে দাঁড়ানো জরুরি।

একটি কন্যাশিশুর নিরাপত্তা শুধু তাকে একটিমাত্র অপরাধ থেকে সুরক্ষা দেওয়া নয়। বরং তার চলাফেরা, শিক্ষা, বন্ধুত্ব, প্রযুক্তি ব্যবহার, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ— সবকিছুর জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে ভয় নয়, নিরাপত্তা ও আস্থার সঙ্গে বড় হতে পারে।

লেখক : আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত
মতামত লেখকের নিজস্ব
  বিষয়:   জাতীয় কন্যাশিশু দিবস  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: