সরকারি চাকরি যেন সোনার হরিণ। যাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন দেশের লাখো তরুণ। স্বপ্নের নাগাল পেতে বছরের পর বছর পড়াশোনা করেন, প্রস্তুতি নেন। একের পর এক পরীক্ষায় বসেন। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় তারা দীর্ণ হন। যুব উন্নয়ন অধিদফতরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে এমন ঘটনাই ঘটেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় গত শনিবার শেষ মুহূর্তে পরীক্ষাটি স্থগিত করা হয়। এতে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তারা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন।
প্রশ্ন হলো, পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠল। তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উপেক্ষা করে পরীক্ষা নিলে প্রকৃত মেধাবীরা হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারতেন। তবে এমন প্রশ্নও রয়েছে যে, পরীক্ষা স্থগিত না করে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ আরও যাচাই-বাছাই করা যেত। প্রশ্নপত্র সত্যিই ফাঁস হয়েছিল কি না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নের মিল ছিল কি না, সেটা খতিয়ে দেখা হয়েছে কি না তা জানা দরকার।
প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আমরা আশা করব, নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ দেশে নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে এমন অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অভিযোগে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। পরে নতুন করে পরীক্ষার আয়োজন করতে হয়েছে।
প্রশ্ন ফাঁসের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে শুধু অভিযোগের পর ব্যবস্থা নিলে চলবে না। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে। প্রশ্নপত্র তৈরি, মুদ্রণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রশ্নপত্র তৈরি করা থেকে শুরু করে পরীক্ষার হলে বিতরণের কোন স্তরে তা ফাঁস হওয়ার সুযোগ রয়েছে সে সম্পর্কে আগাম সতর্ক থাকতে হবে। এ জন্য তদারকি জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হলে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা কমতে পারে। প্রতিটি স্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহি থাকা দরকার। বিদ্যমান আইনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অপরাধে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
দেশে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সীমিতসংখ্যক সরকারি চাকরির জন্য বিপুলসংখ্যক প্রার্থী প্রতিযোগিতা করছেন। তাদের কাছে একটি নিয়োগ পরীক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়, যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মজীবনে এগিয়ে যাওয়ারও সুযোগ। সরকারি চাকরি পাওয়ার কোনো ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তরুণদের মেধা ও পরিশ্রমের মূল্য নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। সরকারি চাকরিতে সুযোগের ন্যায্যতা নিয়ে তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
যুব উন্নয়ন অধিদফতর স্থগিত পরীক্ষা আগামী ১৬ অক্টোবর নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। নতুন প্রশ্নপত্র তৈরি ও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব। ভবিষ্যতে আর কোনো পরীক্ষায় যেন প্রশ্ন ফাঁস না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সরকারি চাকরিতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হলে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা নেওয়ার বিকল্প নেই।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে