গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রাস্তার পাশ থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া সাঁওতাল নেতা লুইস মুর্মু (৭৯) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, তিনি পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন। তবে স্বজন ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অভিযোগ, পূর্বশত্রুতার জেরে তাকে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটনে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় দোষীদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে আদিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো।
স্থানীয় লোকজন জানান, রোববার (১১ অক্টোবর) রাত আটটা থেকে নয়টার মধ্যে উপজেলার কামদিয়া সড়কের শালপাড়া এলাকায় রাস্তার পাশে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে ছিলেন লুইস। পাশের আমগ্রামের বাসিন্দা মহাসিন মণ্ডল বলেন, রাত নয়টার পর স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে বাজারে নিয়ে আসেন। ‘তখন তার অবস্থা খুব খারাপ ছিল, জ্ঞান ছিল না’। পরে তাকে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান আকন্দ জানান, আহত ব্যক্তির মাথায় গুরুতর আঘাত ছিল, অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক এবং তখনো জ্ঞান ফেরেনি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা অবস্থায় তিনি সোমবার (১২ অক্টোবর) মধ্যরাতে মারা যান।
লুইস মুর্মু উপজেলার রাজাহার ইউনিয়নের রাজাবিরাট আদিবাসীপাড়ার সবুর মুর্মুর ছেলে।
গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহফুজ আলম বলেন, লুইস কামদিয়ায় শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরছিলেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যান থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।
তবে স্বজন ও স্থানীয় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের দাবি ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, পূর্বশত্রুতার জেরে সহরগাছি-কামদিয়া সড়ক ধরে যাওয়ার সময় শালপাড়া এলাকার কাছে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে যায় তারা।
এ ঘটনায় লুইসের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত থানায় লিখিত অভিযোগ কিংবা মামলা করা হয়নি। পুলিশ সূত্র জানায়, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে অভিযান ও তদন্ত জোরদার করা হয়েছে।
লুইসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সাঁওতাল সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটিসহ বিভিন্ন আদিবাসী অধিকার সংগঠনের নেতারা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
উল্লেখ্য, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাঁওতালদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে লুইস মুরমু নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। গোবিন্দগঞ্জের আলোচিত ২০১৬ সালের সাঁওতাল পল্লীর সংঘর্ষে নিহত তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ‘সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি’ এবং অন্যান্য আদিবাসী অধিকার রক্ষা সংগঠনের বিভিন্ন আন্দোলন, মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিতে লুইস মুরমু একজন সক্রিয় নেতা ও বক্তা হিসেবে অংশ নিয়েছেন।
সময়ের আলো/জোই