সন্তানের জীবনে ব্যর্থতা আসতেই পারে। পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না করা, ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ না পাওয়া, খেলাধুলায় হেরে যাওয়া কিংবা পছন্দের কাজে সফল হতে না পারা- এসবই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সন্তানের এই ব্যর্থতার মুহূর্তে অভিভাবকের আচরণ তার ভবিষ্যৎ আত্মবিশ্বাস, মানসিক সুস্থতা ও জীবনবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সন্তান ব্যর্থ হলে তাকে দোষারোপ না করে পাশে দাঁড়ানোই অভিভাবকের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত।
আমাদের সমাজে সন্তানের সাফল্যকে অনেক সময় পরিবারের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পরীক্ষায় ভালো ফল করলে প্রশংসা, প্রত্যাশিত ফল না করলে তিরস্কার- এমন অভিজ্ঞতা অনেক শিশুর জীবনে দেখা যায়। কখনো কখনো অভিভাবকেরা অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করে নিজের সন্তানের দুর্বলতা তুলে ধরেন। এতে সন্তান নিজেকে অযোগ্য ভাবতে শুরু করতে পারে।
অথচ ব্যর্থতা কোনো শিশুর সামগ্রিক যোগ্যতার মাপকাঠি নয়। একটি পরীক্ষায় খারাপ ফল করার অর্থ এই নয় যে, সে মেধাবী নয়। কোনো প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, তার মধ্যে প্রতিভা নেই। বরং ব্যর্থতা হতে পারে নিজের সীমাবদ্ধতা চেনা, নতুন কৌশল শেখা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার একটি সুযোগ।
অভিভাবকদের প্রথমেই বুঝতে হবে, সন্তান একটি স্বতন্ত্র মানুষ। তার সক্ষমতা, আগ্রহ, শেখার গতি ও স্বপ্ন অন্যদের থেকে আলাদা হতে পারে।
সন্তানের কথা মন দিয়ে শোনা
ব্যর্থতার পর সন্তান হয়ত হতাশ হবে, কাঁদবে, চুপচাপ থাকবে কিংবা কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইবে না। এমন পরিস্থিতিতে তাকে সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দেওয়া বা ভুল ধরিয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বরং তাকে অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ করে দিন।
এতে সন্তান বুঝতে পারবে, ফলাফল যা-ই হোক, তার জন্য পরিবারের ভালোবাসা ও নিরাপত্তা অটুট রয়েছে। তবে, কথা বলার জন্য জোর করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে কিছুটা সময় ও ব্যক্তিগত পরিসর দিতে হবে।
সন্তানের কষ্টকে ছোট করে দেখা, যেমন ‘এতটুকু ব্যাপারে মন খারাপ করার কী আছে’ বলা- তার অনুভূতিকে অস্বীকার করার শামিল। এটা না করে তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।
বকাঝকা নয়, কারণ খুঁজে বের করা
ব্যর্থতার পেছনে সবসময় অলসতা বা অমনোযোগ দায়ী থাকে না। পড়াশোনায় দুর্বলতা, সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি, পারিবারিক অশান্তি কিংবা কোনো বিষয়ে শেখার বিশেষ অসুবিধা থাকতে পারে। কখনো কখনো নিজের সামর্থ্যের তুলনায় অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপেও সন্তান পিছিয়ে পড়ে। তাই সন্তানকে দোষারোপ করার আগে জানতে হবে, কোথায় সমস্যা হয়েছে। সে কি বিষয়টি বুঝতে পারেনি? প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় পেয়েছিল? পরীক্ষার ভয়ে পরিচিত বিষয়ও ভুলে গেছে? নাকি তার আগ্রহ ও লক্ষ্য অন্য কোথাও?
কারণ বুঝতে পারলে সমাধান বের করা সহজ হয়। প্রয়োজনে শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরামর্শক বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে।
অন্যের সঙ্গে তুলনা নয়, নিজের অগ্রগতি মূল্যায়ন
‘তোমার বন্ধুটি ভালো করেছে, তুমি পারলে না কেন?’-এ ধরনের প্রশ্ন সন্তানের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করতে পারে। তুলনার ফলে সে নিজের উন্নতির দিকে মনোযোগ না দিয়ে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চাপ অনুভব করে।
প্রতিটি শিশুর শেখার ধরন ও বিকাশের গতি এক নয়। তাই অন্যের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা না করে আগের অবস্থার তুলনায় সে কতটা উন্নতি করেছে, সেটি দেখতে হবে। সন্তান যদি আগের চেয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করে, ভুল থেকে শেখে কিংবা কঠিন বিষয় বোঝার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যায়, তবে সেই প্রচেষ্টার প্রশংসা করা প্রয়োজন। এতে তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।
ব্যর্থতা থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করা
শুধু সান্ত্বনা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সন্তানের মন কিছুটা স্থির হলে তার সঙ্গে বসে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা দরকার। কোথায় ভুল হয়েছে, কোন দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং কীভাবে প্রস্তুতি নিলে ভালো করা সম্ভব- এসব বিষয়ে বাস্তবসম্মত আলোচনা করা যেতে পারে।
ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করা এ ক্ষেত্রে কার্যকর। যেমন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পড়া, কঠিন বিষয়গুলো শিক্ষকের সাহায্যে বোঝা, নিয়মিত অনুশীলন করা কিংবা সপ্তাহ শেষে নিজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা।
তবে, পরিকল্পনা যেন শাস্তির মতো না হয়। সন্তানকে পরিকল্পনা তৈরির অংশীদার করতে হবে, যাতে সে নিজের দায়িত্ব বুঝতে শেখে। প্রয়োজনে পরিকল্পনা পরিবর্তনের সুযোগও রাখতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যর্থতার পরপরই বড় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দেওয়া। কিছুটা সময় নিয়ে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পথ নির্ধারণ করাই উত্তম।
সন্তানের স্বপ্ন ও সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া
অনেক সময় অভিভাবকেরা নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। সন্তানকে চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পেশায় প্রতিষ্ঠিত দেখার আকাঙ্ক্ষা থেকে তার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। কিন্তু সন্তানের আগ্রহ, দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সেই প্রত্যাশার মিল নাও থাকতে পারে।
মনে রাখতে হবে, একটি নির্দিষ্ট পথে সফল না হলেও অন্য পথে সফল হওয়ার সুযোগ রয়েছে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি সৃজনশীলতা, কারিগরি দক্ষতা, খেলাধুলা, প্রযুক্তি, শিল্পকলা কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ আছে। অভিভাবকের দায়িত্ব সন্তানের হয়ে জীবন বেছে নেওয়া নয়; বরং তাকে নিজের শক্তি ও আগ্রহ চিনতে সাহায্য করা। বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে বিকল্প পথ সম্পর্কে জানানো এবং উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করা।
মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া
ব্যর্থতার পর কিছুদিন মন খারাপ থাকা স্বাভাবিক। তবে সন্তান যদি দীর্ঘদিন নিজেকে গুটিয়ে রাখে, ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন দেখা দেয়, সবকিছুতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে কিংবা নিজেকে মূল্যহীন মনে করতে থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে শুধু পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ না দিয়ে তার মানসিক অবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। প্রয়োজনে মনোবিজ্ঞানী, মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী বা উপযুক্ত চিকিৎসকের সহায়তা নিতে হবে।
শর্তহীন ভালোবাসার আশ্রয় হয়ে ওঠা
সন্তানকে বোঝাতে হবে, তার সাফল্যে পরিবার আনন্দিত হয় ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তাকে সবসময় সফল হতে হবে না। পরীক্ষার ফল, পুরস্কার কিংবা সামাজিক স্বীকৃতির বাইরেও তার নিজস্ব মূল্য রয়েছে।
অভিভাবকেরা নিজের জীবনের ব্যর্থতা ও তা থেকে শেখার অভিজ্ঞতাও সন্তানের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। এতে সন্তান বুঝতে পারবে, জীবনে ভুল করা অস্বাভাবিক নয় এবং ভুলের পর ঘুরে দাঁড়ানোই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সফল হওয়ার গল্প নয়, চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, ভুল স্বীকার করা, সাহায্য চাওয়া এবং নতুনভাবে শুরু করার গুরুত্বও তাকে শেখাতে হবে।
মনে রাখতে হবে, সন্তানের প্রতিটি ব্যর্থতাকে যদি অপমান ও শাস্তির অভিজ্ঞতায় পরিণত করা হয়, তবে সে ভুল লুকাতে শিখতে পারে। ব্যর্থতার মুহূর্তে যদি সে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পায়, তবে নিজের ভুল স্বীকার করে তা থেকে শেখার সাহস অর্জন করতে পারে।
সময়ের আলো/মহু