চাকাগুলো থেমে আছে অনেক দিন। কোনোটির টায়ারের বাতাস নেই, কোনোটির গায়ে ধুলার পুরু আস্তরণ, কোনোটির লোহায় লেগেছে লালচে মরিচা। মোটরসাইকেলের পাশে প্রাইভেটকার, তার পাশে বাস-ট্রাক, একটু এগোলেই সারি সারি অটোরিকশা। প্রথম দেখায় মনে হবে, পরিত্যক্ত যানবাহনের কোনো ভাগাড়, অথচ এগুলো ফেলে দেওয়া গাড়ি নয়। বেশিরভাগই বিভিন্ন মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা। একসময় এসব যান রাস্তায় ছুটত, কারও রুটি-রুজির ভরসা ছিল, কারও জমানো টাকার স্বপ্ন। এখন বছরের পর বছর রোদ ও বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে।
এই দৃশ্য গাইবান্ধার কোনো একটি থানার নয়। জেলার সাতটি থানা ও আদালত চত্বর মিলিয়ে জব্দ যানবাহনের সংখ্যা এখন ৪২৪। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১১৫টি পড়ে আছে আদালতের মালখানায়। থানাগুলোর মধ্যে গোবিন্দগঞ্জে জমেছে ৯০টি, গাইবান্ধা সদরে ৫৭টি, পলাশবাড়ীতে ৫৫টি, সুন্দরগঞ্জে ৪২টি, সাঘাটায় ৩০টি এবং সাদুল্লাপুরে ২৬টি। সবচেয়ে কম ৯টি যানবাহন আছে ফুলছড়ি থানায়। সংখ্যা কম-বেশি হলেও সব জায়গার ছবি প্রায় একই- খোলা আকাশের নিচে সারি সারি স্থবির যান।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব যানবাহনের বড়ো অংশ জব্দ হয়েছিল মাদকসহ নানা অপরাধের মামলায়। এর মধ্যে চোরাই ও কাগজপত্রবিহীন গাড়িও আছে। কোনো কোনোটি আলামত হিসেবে পড়ে আছে বছরের পর বছর। মামলা চলছে তার নিজস্ব গতিতে, যানগুলো অপেক্ষা করছে রায়ের, নিলামের বা নিষ্পত্তির। নিয়মিত ব্যবহার নেই, রক্ষণাবেক্ষণও নেই। ফলে, অনেক গাড়ি এখন নষ্ট হওয়ার পথে। যেগুলোর বাজারমূল্য একসময় ছিল উল্লেখযোগ্য, সময়ের সঙ্গে সেগুলোর দাম কমছে। খোলা আকাশের নিচে থাকতে থাকতে যন্ত্রাংশে ধরেছে মরিচা, অনেক যান আর চালানোর মতো অবস্থায় নেই।
এই ক্ষতির দায় কার, সে প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। তবে, ক্ষতিগ্রস্ত দুই পক্ষই। একদিকে প্রকৃত মালিকেরা, যাদের সম্পদ আইনি জটে আটকে থেকে ক্রমে মূল্য হারাচ্ছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র, সময়মতো নিলাম হলে বিপুল রাজস্ব পেতে পারত!
নিলামের কথা উঠতেই সামনে আসে সবচেয়ে অস্বস্তিকর তথ্যটি। গাইবান্ধা চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির রেজাউল করিম সরকার জানান, সর্বশেষ যানবাহন নিলামের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছিল ২০২০ সালের নভেম্বরে। এরপর প্রায় ৬ বছর পেরিয়ে গেছে, নতুন করে কোনো নিলাম হয়নি। এ সময়ে আরও যানবাহন জব্দ হয়েছে, আরও জায়গা দখল হয়েছে, আর পুরনো গাড়িগুলো আরও জীর্ণ হয়েছে। নাজির অবশ্য বলছেন, বর্তমানে আবারও নিলামের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পুলিশ প্রশাসনও বিষয়টি স্বীকার করছে। গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শরীফ আল রাজীব পিপিএম বলেন, ‘মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা যানবাহনগুলো যাতে অযত্নে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যেসব মামলা নিষ্পত্তির পর্যায়ে রয়েছে, সেসব মামলার আলামত দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’ তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আদালত চত্বরে থাকা যানবাহনের নিলাম চলছে ধীরগতিতে।
আইনজীবীদের মতে, সমাধানের পথ খুব দুর্বোধ্য নয়। যেসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, সেগুলোর আলামত অবিলম্বে নিলামের আওতায় আনা দরকার। তাতে আদালত ও থানার জায়গার সংকট কমবে, আবার দীর্ঘদিন পড়ে থেকে মূল্যবান যান নষ্ট হওয়ার হাত থেকেও রক্ষা পাবে।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মিজানও একই কথা বলেন। তার ভাষ্য, ‘যেসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে, সেসব মামলার আলামত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা যানবাহনগুলোরও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা ও নিলামের ধীরগতিই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। এর ফল শুধু থানা ও আদালতের জায়গা দখল নয়, প্রতিদিন কমছে যানবাহনগুলোর দামও। দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও নিলাম সম্পন্ন করা গেলে আলামতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা যেমন সম্ভব হবে, তেমনি রক্ষা পাবে মূল্যবান সম্পদ ও সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব।
সময়ের আলো/মহু