‘রিফিউজি হিসেবেই আছি’, দেশে ফিরতে চান সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

নয় বছরের দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বাইরে আছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে ছোট মেয়ের সঙ্গে

2026-10-13T16:30:38+00:00
2026-10-13T16:30:38+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
‘রিফিউজি হিসেবেই আছি’, দেশে ফিরতে চান সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৩০ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
নয় বছরের দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বাইরে আছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে ছোট মেয়ের সঙ্গে বসবাস করছেন এই বিচারপতি। তবে সেখানে এখনো স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাননি তিনি। তার দাবি, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে একটি সাজানো মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। সেই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কারণে কানাডায় তার অভিবাসনপ্রক্রিয়া আটকে আছে। এর মধ্যে দেশে ফিরে পাসপোর্টের জন্য আবেদনও করেন তিনি। তবুও কোনো সাড়া পাননি তিনি।

নিজের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বিচারপতি এস কে সিনহা নামে পরিচিত এই সাবেক প্রধান বিচারপতি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি তো রিফিউজি হিসেবেই আছি এখন। কারণ হলো শেখ হাসিনার সরকার আমাকে একটা কনভিকশন (দোষী সাব্যস্ত করা) দিয়েছিল, একটা সাজানো মামলায়। …যার পরিপ্রেক্ষিতে আমি স্ট্যাটাসবিহীন একেবারে ফ্লোটিংম্যান, যাকে বলে ভাসমান লোক হিসেবে আছি।’

গত ২৭ আগস্ট, ২ সেপ্টেম্বর ও গতকাল সোমবার গণমাধ্যমের সঙ্গে এক আলাপকালে নিজের দেশত্যাগ, পদত্যাগ, পেনশন সুবিধা না পাওয়া এবং দেশে ফেরার চেষ্টা নিয়ে কথা বলেন কে সিনহা।

তিনি বলেন, কানাডায় তার স্ত্রীর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা পিআর হয়েছে। তার নিজের পিআরও অনুমোদিত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে পুলিশ রিপোর্ট না পাওয়ায় তার কার্ড ইস্যু হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার পিআর অ্যাপ্রুভ হয়েছে। তবে পুলিশ রিপোর্ট পাইনি, কার্ড ইস্যু হয়নি।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। এরপরপরই দেশে ফেরার প্রস্তুতি হিসেবে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন সাবেক এই বিচারপতি। গণমাধ্যমকে এনটিই জানান তিনি। তার মতে, কানাডার টরন্টোতে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে পাসপোর্টের বিষয়ে সর্বশেষ ৪ আগস্ট ই-মেইলে তাগাদা দিয়েছেন। কিন্তু কোনো উত্তর পাননি। তিনি বলেন, ‘আমি দেশে ফিরতে চাই। পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছি, দুই বছরের বেশি হয়ে গেল। কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে রিমাইন্ডার দিয়ে সর্বশেষ ৪ আগস্ট মেইল পাঠিয়ে বললাম—এর কী অবস্থা? কোনো রেসপন্স পাইনি।’

যেভাবে দেশত্যাগ করেন প্রধান বিচারপতি

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কথা। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম অমুসলিম প্রধান বিচারপতি। তার চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার ৮২ দিন আগেই পদত্যাগ করেন তিনি।

২০১৭ সালের ২ অক্টোবর তার ছুটির খবর প্রকাশ্যে আসে। এরপর ছুটিতে থাকা অবস্থায় বিদেশযাত্রা এবং বিদেশ থেকে ১০ নভেম্বর পদত্যাগপত্র পাঠানোর ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ওই বছরের ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন তিনি। সেই থেকে দেশের বাইরে রয়েছেন এই বিচারপতি।

এসকে সিনহার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে অস্ট্রেলিয়া, এরপর কানাডা, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে আবার কানাডায় ফেরেন তিনি। বর্তমানে ছোট মেয়ের সঙ্গে টরন্টোতে বসবাস করছেন।


সরকারের সঙ্গে দূরত্ব হয় যেভাবে

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগেই আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল নির্বাচনটি বর্জন করে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক সরকারগুলো সাধারণত প্রধান বিচারপতি পদে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে দেখতে চায়। একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও এর ব্যতিক্রম ছিল না বলে তাদের ধারণা।

প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় ছিলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। দায়িত্ব পালনকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানিতে আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চে ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত হওয়ার সময়ও তিনি প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ছিলেন।

তবে তার সঙ্গে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দূরত্ব স্পষ্ট হতে শুরু করে অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা নিয়ে বিরোধের মধ্য দিয়ে। পরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ এবং সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় সেই বিরোধকে আরও তীব্র করে।

২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস হয়। এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান করা হয়। ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট হলে হাইকোর্ট রায় দেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে।

২০১৭ সালের ৩ জুলাই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে দেন। এর ফলে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান বহাল থাকে। একই বছরের ১ আগস্ট রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়।

রায়ে গণতন্ত্র, রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, সুশাসন, দুর্নীতি ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দেন বিচারপতি সিনহা। এসব পর্যবেক্ষণ নিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, নেতা ও সরকারপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা তার পদত্যাগের দাবিও তোলেন। অন্যদিকে রায়কে স্বাগত জানায় বিএনপি।

২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ওই রায় বাতিলের জন্য যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব পাস হয়। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ সম্পর্কে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির দেওয়া ‘অসাংবিধানিক, আপত্তিকর, অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ’ বাতিলের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়। এর আগে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ ১৮ জন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য রায়টি নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় সবাই প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করেন।

রাষ্ট্রপক্ষ ২০১৭ সালে ওই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। পরে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর আপিল বিভাগ আবেদনটি পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করেন। এতে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের পরিবর্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানগুলো পুনর্বহাল হয়।

প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পদত্যাগের আগ পর্যন্ত দুই বছর নয় মাস ২৫ দিন দায়িত্ব পালন করেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তার লেখা ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ই শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের সঙ্গে বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে বলে তিনি মনে করেন।

ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের শুনানি শেষ হয় ২০১৭ সালের ১ জুন। সেদিন আপিল বিভাগ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। ৩ জুলাই রায় ঘোষণা করা হয়।

নিজের আত্মজীবনীমূলক বই ‘আ ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’-তে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা উল্লেখ করেছেন, রায় ঘোষণার আগে তাকে বঙ্গভবনে আলোচনার জন্য চায়ের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ২০১৭ সালের ১ জুলাই সকালে তার ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একটি কল আসে। ফোনকারী নিজেকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সামরিক সচিব পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা অনুযায়ী সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় চায়ের আমন্ত্রণে বঙ্গভবনে যাওয়ার অনুরোধ জানান। পরে সামরিক সচিবের কাছ থেকে এ বিষয়ে একটি খুদে বার্তাও পান।

সেই আমন্ত্রণ অনুযায়ী ২ জুলাই সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে যান তিনি। সেখানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম উপস্থিত ছিলেন। আনিসুল হক বর্তমানে কারাবন্দী। মাহবুবে আলম প্রয়াত হয়েছেন।

সিনহার ভাষ্য, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিয়ে কথা বলেন এবং সরকারের পক্ষে রায় দেওয়ার অনুরোধ জানান। এ সময় তিনি বলেন, সরকারের পক্ষে মতামত দিলেও হাইকোর্টের রায় বাতিল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, বিষয়টি নিয়ে তিনি ও আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরা তখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

সাবেক এই প্রধান বিচারপতির অভিযোগ, রায় ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তে বিচারকদের মতামত প্রকাশের কথা থাকলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল তাকে সরকারের পক্ষে অবস্থান নিতে চাপ দেন। অন্য বিচারকেরা বিপক্ষে মত দিলেও তাকে সরকারের পক্ষে মত দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। তিনি নিজের অবস্থানে অনড় থাকায় প্রধানমন্ত্রী মেজাজ হারিয়ে ফেলেন বলে জানান সিনহা।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি একপর্যায়ে উত্তপ্ত বিতর্কে রূপ নেয়। তখন তিনি পদত্যাগ করার কথা বলেছিলেন। তবে প্রধানমন্ত্রীসহ উপস্থিত সবাই তাকে পদত্যাগ না করার অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, ষোড়শ সংশোধনীর রায় ঘোষণার আগে পদত্যাগ করলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। তাদের অনুরোধে সে সময় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন বলে জানান সিনহা।

ছুটির ঘোষণা ও গৃহবন্দী থাকার অভিযোগ

২০১৭ সালের অবকাশকালীন ছুটি শেষে ৩ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল। এর এক দিন আগে, ২ অক্টোবর, এক মাসের ছুটির কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তার ছুটি নিয়ে তখন রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

তৎকালীন সরকারের মন্ত্রীরা জানান, শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রধান বিচারপতি ছুটি নিয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ অক্টোবর ছুটিতে থাকা অবস্থায় জনসমক্ষে আসেন সিনহা।

নিজের বইয়ে তিনি লিখেছেন, অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর সকালে আদালতে গিয়েছিলেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, সেদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তার ব্যক্তিগত সচিব তাকে বলেন, ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাইফুল আবেদীন দুপুর ১২টায় তার সঙ্গে দেখা করতে চান। তিনি তাকে আসার অনুমতি দেন।

সিনহার দাবি, সাক্ষাতে ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালন করছেন। তাকে ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত চার মাসের ছুটিতে যাওয়ার কথা বলা হয়। তবে তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সেদিন বাসায় ফেরার পর নিজেকে গৃহবন্দী অবস্থায় পান বলে দাবি করেন সাবেক এই প্রধান বিচারপতি।

এ সময় আইন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিনের ছুটি রাষ্ট্রপতি অনুমোদন করেছেন। তার ছুটির সময়ে আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।


‘বিচার বিভাগের স্বার্থে সাময়িকভাবে যাচ্ছি’

সরকারের পক্ষ থেকে অসুস্থতার কারণে ছুটির কথা বলা হলেও বিদেশে যাওয়ার আগে ২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তিনি বলেন, তিনি অসুস্থ নন, ভালো আছেন। তবে কিছুটা বিব্রত। বিচার বিভাগের স্বার্থে এবং বিচার বিভাগ যাতে কোনোভাবে কলুষিত না হয়, সে জন্য সাময়িকভাবে দেশের বাইরে যাচ্ছেন।

সেদিন গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে লিখিত বিবৃতিও দেন তিনি। তাতে বলেন, একটি রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী এবং বিশেষ করে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী যেভাবে তার সমালোচনা করেছেন, তাতে তিনি বিব্রত।

তার দেশত্যাগের ঘটনায় তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে যা ঘটেছে, তা বিচার বিভাগের ওপর সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ।

সিনহার দাবি, তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি এ ঘটনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, তাকে চাপ দিতে ডিজিএফআইকে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিচারক হওয়ার কারণে তাকে আয়নাঘরে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে অভিযোগ করেন, আপিল বিভাগের সহকর্মী বিচারকেরা বঙ্গভবন থেকে ফেরার পর রাতারাতি তার সঙ্গে একই বেঞ্চে বসতে অস্বীকৃতি জানান।

সাবেক এই প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন প্রধান বলেছিলেন, “স্যার আপনি থাকতে পারবেন না, আপনাকে দেশের বাইরে যেতে হবে।” ডিজিএফআই ও শেখ হাসিনার চোখ রাঙানি আমি ভয় পাইনি।...ভয় পেয়েছিলাম সহকর্মীদের ভূমিকায়। সহকর্মী বিচারকেরা যেহেতু সহযোগিতা করলেন না, আমি কী আর করব?’

তিনি আরও বলেন, ‘নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না, একপর্যায়ে দেশের বাইরে চলে এলাম। ১৩ অক্টোবর (২০১৭) দেশ থেকে বের হই।’

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের কারণেই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল বলে মনে করেন সিনহা। তার বক্তব্য, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে ছিল। মাসদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা বাস্তবায়ন হচ্ছিল না। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়েছিল। এর প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি রায় দেওয়ার পর থেকেই তার প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয় বলে দাবি করেন।

পদত্যাগ ও পেনশন নিয়ে জটিলতা

চাকরিজীবনের পাওনা সুবিধার মধ্যে অর্জিত ছুটি নগদায়ন বা ল্যাম্প গ্রান্ট পেয়েছেন বলে জানান সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তার ভাষ্য, ১৮ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থের মধ্যে প্রথমে ১২ মাসের টাকা দেওয়া হয়েছিল। পরে বাকি ছয় মাসের টাকাও পেয়েছেন। তবে পেনশন এখনো দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সিনহা বলেন, পেনশনের জন্য কানাডা থেকে আবেদন করার পর তাকে জানানো হয়েছে, কনসাল জেনারেলের কাছ থেকে তার স্বাক্ষর কাউন্টারসাইন করাতে হবে। এ প্রক্রিয়াকে অপমানজনক মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আই এম দ্য লাস্ট পারসন, একজন জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যায়ের বা অফিসারের কাছে গিয়ে আমার সিগনেচার কাউন্টার সাইন করব, এটা অপমানজনক।’

নিজের অবস্থান বোঝাতে তিনি বলেন, ‘আমি না খেয়ে মরছি কিন্তু আমি কোনো দিনই “বো ডাউন” (নত হওয়া) করি নাই।’

সাজানো মামলায় দণ্ডের অভিযোগ

দেশত্যাগের পর সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছিল বলে জানা যায়। তবে সব মামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানেন না বলে জানান তিনি। তার বক্তব্য, অন্তত একটি মামলার রায় তিনি পড়েছেন, যে মামলায় তাকে দণ্ড দেওয়া হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা ওই মামলায় অভিযোগ ছিল, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) চার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ২০২১ সালের ৯ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪-এর বিচারক মামলাটির রায় দেন। রায়ে দুটি ধারায় সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে যথাক্রমে সাত ও চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

তবে সাবেক এই প্রধান বিচারপতি মামলাটিকে সাজানো বলে দাবি করেন। তার বক্তব্য, উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের বাড়ি বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে চার নম্বর সেক্টরে একটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছিলেন। ওই লেনদেনের তথ্য আয়কর রিটার্নেও উল্লেখ করেছিলেন বলে জানান তিনি। তার অভিযোগ, মামলায় এসব তথ্য আড়াল করে মনগড়া অভিযোগ আনা হয়েছে।

দেশে ফেরার অপেক্ষা

নয় বছর ধরে দেশের বাইরে থাকা সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এখন দেশে ফিরতে চান। এ জন্য পাসপোর্টের আবেদন করলেও দুই বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন বলে তার দাবি। টরন্টোয় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করেও কোনো উত্তর পাননি বলে জানান তিনি।

কানাডায় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তার স্ত্রীর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি মিলেছে। নিজের পিআরও অনুমোদিত হয়েছে বলে দাবি করলেও পুলিশ রিপোর্ট ও কার্ড ইস্যু না হওয়ায় প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়নি।

সাবেক এই প্রধান বিচারপতির অভিযোগ, বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে করা মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি কানাডায় তার অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে ফেরার জন্য পাসপোর্ট পাওয়া এবং পেনশন সুবিধা নিশ্চিত করা—দুটিই এখন তার সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে আছে।

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   রিফিউজি  দেশ  বিচারপতি  সিনহা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: