পৃথিবীজুড়ে এখন কিউআর কোডের জয়জয়কার। চীনে ভিক্ষুকও কিউআরে ভিক্ষা নেয়, ভারতে চা-ওয়ালা কিউআরে চায়ের দাম নেয়। সেই নতুন দুনিয়ায় এবার প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ, যার নাম— বাংলা কিউআর। প্রাথমিকভাবে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে এর যাত্রা শুরু হলেও আগামী ডিসেম্বর থেকে সারা দেশে চালু হচ্ছে একক, অভিন্ন কিউআর কোড ‘বাংলা কিউআর’। এর মাধ্যমে দেশের যেকোনো ব্যাংক, বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়— সব মাধ্যমের টাকা একটি কিউআর দিয়েই লেনদেন করা যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এটি হবে ক্যাশলেস বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।
বাংলা কিউআর কী ও কীভাবে কাজ করবে : রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকার একটি দোকানে ঢুকলে দেখা যাবে দেয়ালে ৪-৫টি কিউআর কোড। বিকাশের আলাদা, নগদের আলাদা, রকেটের আলাদা। ক্রেতা বিভ্রান্ত হন— আমার তো বিকাশ আছে, দোকানে নগদের কিউআর। দোকানদারও বিরক্ত— আলাদা আলাদা হিসাবে টাকা ঢোকে, হিসাব মেলানো কঠিন। বাংলা কিউআরে হবে এই সমস্যার সমাধান। এটি হবে ইন্টার অপারেবল, অর্থাৎ আন্তঃপরিচালনাযোগ্য।
এটি কাজ করবে মূলত এভাবে— দোকানদার তার ব্যাংক থেকে একটি মাত্র বাংলা কিউআর নেবেন। সেই কিউআর দোকানে লাগাবেন। ক্রেতা তার যেকোনো অ্যাপ- বিকাশ, নগদ, রকেট, সিটি টাচ, ব্র্যাক আস্থা— যেকোনো একটি দিয়ে স্ক্যান করে টাকা দেবেন। টাকা সরাসরি দোকানদারের ব্যাংক হিসাবে চলে যাবে, সেটা ১০ সেকেন্ডের মধ্যে। এর পেছনে কাজ করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি)। সব লেনদেন এই সুইচ হয়ে যাবে। ভারতে এই সিস্টেমের নাম ইউপিআই (ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস)। ভারতে এখন মাসে ১৮০০ কোটি লেনদেন হয় ইউপিআইতে। রাস্তার ফুচকাওয়ালা থেকে বিমানের টিকেট— সব লেনদেনই ইউপিআইতে। বাংলাদেশে বাংলা কিউআর সেই ইউপিআইর মতোই।
কেন বাংলা কিউআর দরকার :
বাংলা কিউআর প্রচলনের পেছনে অনেক কারণ থাকলেও তিনটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত ক্যাশলেস বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা। বাংলাদেশে এখনও মোট লেনদেনের ৮০ শতাংশই নগদ টাকায় হয়। বিশ্বে এই হার গড়ে ৩০ শতাংশ। নগদ টাকা ছাপানো, বহন করা, নিরাপত্তা— সব মিলিয়ে সরকারের বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। ক্যাশলেস হলে এই খরচ বাঁচবে। দুর্নীতি, কালো টাকা, ছিনতাই কমবে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩১ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ লেনদেন ক্যাশলেস করা। বাংলা কিউআর সেই লক্ষ্যের প্রথম সিঁড়ি।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আদায় বাড়ানো। এটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দেশে রাজস্ব আদায় কমছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। আয় কমায় সরকার ব্যাংক খাত থেকে প্রচুর ঋণ নিচ্ছে। রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার মূল কারণ— ব্যবসায়ীরা বিক্রি লুকিয়ে ভ্যাট ফাঁকি দেয়। একজন ইলেকট্রনিক্স দোকানদার মাসে ৫০ লাখ টাকা বিক্রি করলেও খাতায় দেখায় ২০ লাখ। বাকি ৩০ লাখ ক্যাশে বিক্রি করে। ফলে ভ্যাট পায় না সরকার। বাংলা কিউআর চালু হলে সব লেনদেনের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারে।
এনবিআর চাইলে সেই তথ্য নিয়ে যাচাই করতে পারবে— কার দোকানে প্রকৃত বিক্রি কত। ফলে ভ্যাট ফাঁকি কমবে। শুধু তাই নয়, বাংলা কিউআর শুধু পেমেন্ট সিস্টেম নয়, এটি রাজস্ব বাড়ানোর হাতিয়ার হবে। দেশে টিআইএনধারী ১ কোটি ১০ লাখ, কিন্তু রিটার্ন দেন মাত্র ৩৫ লাখ। ফেসবুকে ব্যবসা করেন ৫ লাখ উদ্যোক্তা, তাদের বেশিরভাগ করের বাইরে। বাংলা কিউআর তাদের করের আওতায় আনতে সাহায্য করবে এবং সরকারের আয় বাড়বে।
তৃতীয়ত, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে জালিয়াতি ও হয়রানি বন্ধ হবে। বর্তমানে জালিয়াতি বড় সমস্যা। প্রতারকরা রাতে দোকানের আসল কিউআরের ওপর নিজের কিউআর স্টিকার লাগিয়ে দেয়। গ্রাহক টাকা দিলেও দোকানদার পায় না। গত ৬ মাসে এমন ৩০০ অভিযোগ পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। বাংলা কিউআরে প্রতিটি কিউআরে দোকানের নাম, ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করা থাকবে। স্ক্যান করলেই দোকানের নাম ভেসে উঠবে। ফলে জালিয়াতি প্রায় অসম্ভব।
ব্যবসায়ী ও গ্রাহকের লাভ-ক্ষতি : গ্রাহককে আর ভাবতে হবে না দোকানে বিকাশ আছে কি না। যেকোনো অ্যাপ দিয়েই পেমেন্ট করা যাবে। লেনদেন হবে ১০ সেকেন্ডে। ক্যাশ বহনের ঝুঁকি কমবে।
বড় আছে ব্যবসায়ীদেরও লাভ। এতে বড় সুপারশপ, রেস্তোরাঁ মালিকরা খুশি। বাংলা কিউআর দিয়ে পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে গ্রাহক বা ক্রেতার অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো চার্জ কাটা হয় না। ক্রেতা যত টাকার পণ্য কিনবেন, তার অ্যাকাউন্ট থেকে ঠিক তত টাকাই কাটা হবে। তবে লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট বা দোকানদারের ওপর ফি প্রযোজ্য হয়। মার্চেন্ট বা দোকানদারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা ফি সর্বনিম্ন ১ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে (ভ্যাটসহ বা ক্ষেত্রবিশেষে ১ শতাংশ থেকে ১.১৫ শতাংশ), যা দোকানদারের প্রাপ্য টাকা থেকে কাটা হয়।
তা ছাড়া ডিজিটাল লেনদেন উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআর লেনদেনে ইন্টারব্যাংক চার্জ মওকুফ এবং প্রণোদনা চালু করেছে। এর মাধ্যমে টাকা সরাসরি ব্যাংকে জমা হবে, ক্যাশ মেলানোর ঝামেলা কমবে। তবে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা কিউআর কোড নিয়ে কিছুটা আপত্তি তুলেছেন। তাদের যুক্তি— আগে ক্যাশে বিক্রি করলে হিসাব লুকানো যেত। এখন সব ব্যাংকে ঢুকলে আয়কর অফিস থেকে নোটিস আসবে। এ জন্য ছোট ব্যবসায়ীরা বাংলা কিউআর নেওয়ার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী না।
দোকান মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, শুরুতে কিউআরে টাকা নিলে টাকা ১-২ দিন পর ব্যাংকে ঢুকত। ক্যাশে সঙ্গে সঙ্গে মালামাল কেনা যায়। এ ছাড়া গ্রামে ইন্টারনেট দুর্বল হওয়ায় লেনদেনে ঝামেলা পোহাতে হবে ব্যবসায়ীদের।
কিউআরের নতুন দুনিয়ায় যেতে বাধা কোথায় :
এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের অপ্রতুলতা। গ্রামে এখনও ৪০ শতাংশ দোকানে ভালো ইন্টারনেট নেই। ৩০ শতাংশ মানুষের স্মার্টফোন নেই। তা ছাড়া গ্রাম পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে এখনও তেমন একটা সচেতন না। অনেক মানুষ এখনও কিউআর স্ক্যান করতে ভয় পান। মনে করেন টাকা কেটে নেবে। তা ছাড়া চার্জ কর্তন নিয়েও আপত্তি আছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ইউপিআই সম্পূর্ণ ফ্রি।
বাংলাদেশে ০.৭ শতাংশ চার্জও ছোট দোকানদারের জন্য বেশি মনে করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংককে এটি ফ্রি বা ০.২ শতাংশে আনার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। তা ছাড়া বাংলা কিউআর কোড নিয়ে কিছু ব্যাংকেরও অনীহা রয়েছে। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানিগুলো নিজেদের কিউআরের ব্যবসা হারাতে চায় না। তারা বাংলা কিউআরকে সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ আছে।
কিউআর কোডে কতটা পিছিয়ে বাংলাদেশ : প্রতিবেশী দেশ ভারত ইউপিআই দিয়ে ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে এখন বিশ্বের শীর্ষে। মাসে ১৮০০ কোটি লেনদেন হয়। যার মাধ্যমে লেনদেন হয় ৫০ লাখ কোটি টাকা। চীনে উইচ্যাট পে ও আলিপে দিয়ে ৯০ শতাংশ লেনদেন হয়। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে মাসে লেনদেন ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু তার ৯০ শতাংশই ক্যাশ আউট। অর্থাৎ মানুষ মোবাইলে টাকা এনে আবার ক্যাশ করে ফেলে। কিউআরে পেমেন্ট এখনও মাত্র ২ শতাংশ। বাংলা কিউআর এই ২ শতাংশকে ২০ শতাংশে নিয়ে যেতে পারে।
তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আপত্তি ও কিছু ব্যাংকের অনীহা সত্ত্বেও এই ডিজিটাল যুগে বাংলা কিউআরের বিকল্প নেই। এটি শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি একটি নতুন অর্থনৈতিক দর্শন। এটি সফল হলে তিনটি বড় লাভ হবে— ক্যাশলেস বাংলাদেশ হবে, রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং ব্যাংকের ওপর সরকারের ঋণ নির্ভরতা কমবে। তবে সরকারকে ছোট ব্যবসায়ীদের আস্থায় নিতে হবে। চার্জ ফ্রি করতে হবে, ইন্টারনেট সহজ করতে হবে এবং প্রচার বাড়াতে হবে। তা না হলে ভারতের মতো বিপ্লব বাংলাদেশে হবে না। নতুন দুনিয়ায় যেতে হলে পুরোনো ভয় ভাঙতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি