সামষ্টিক অর্থনীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা পাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চলমান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের এ অগ্রগতি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আগামী জুন মাসে আইএমএফের বোর্ড মিটিং পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এবং সামগ্রিক প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.২ শতাংশে নামতে পারে এবং গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সংকট কাটাতে কর্মসংস্থান, বেসরকারি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছে দাতা সংস্থাগুলো।
গত ১২ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হওয়া আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সপ্তাহব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বার্ষিক সভায় এসব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর করণীয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সম্মেলন চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। বিশ্বের ১৯০টি দেশ থেকে ১৫ হাজারের বেশি প্রতিনিধি এতে অংশ নিচ্ছেন। সম্মেলন ঘিরে ব্যাংককে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সম্ভাব্য বিক্ষোভ, ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা এবং যানজট মোকাবিলায়ও বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণসহায়তা নিয়ে আলোচনা : গতকাল মঙ্গলবার ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণসহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। এটা একটা আলোচনা। এই আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এটি একটি প্রক্রিয়া, যা আগামী কয়েক মাস চলবে।’
তিনি জানান, আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দুই পক্ষের করণীয় নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকায়ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসূচি এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সংস্থাটির সমঝোতা রয়েছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের গৃহীত নীতির সঙ্গেও বিশ্বব্যাংক একমত।
আমির খসরু বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্যে ছিল। আগের সময়ের বিভিন্ন দায়দায়িত্বের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এসব বিষয় বিশ্বব্যাংক অনুধাবন করছে।
প্রবৃদ্ধি কমার আশঙ্কা, মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে :
আইএমএফের সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে। আগের পূর্বাভাসের তুলনায় এ হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
এর আগে এডিবি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাংক ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। আইএমএফের নতুন প্রক্ষেপণে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতি উঁচু পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানুষের প্রকৃত আয়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবার ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে উঠতে পারে, যা পরের বছর কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
১২০ কোটি তরুণের বিপরীতে চাকরি পাবে ৪২ কোটি : কর্মসংস্থান সংকটের ব্যাপকতা তুলে ধরে বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করবে। অথচ বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী নতুন চাকরি সৃষ্টি হতে পারে প্রায় ৪২ কোটি। অর্থাৎ সম্ভাব্য কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগের ব্যবধান প্রায় ৭৮ কোটি।
তবে এ ব্যবধানকে সরাসরি বেকারের সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছানো সবাই একই সময়ে চাকরি খুঁজবেন না। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের পূর্বাভাসও বর্তমান প্রবণতার ওপর নির্ভরশীল।
চাকরির বাজারে এআইয়ের প্রভাব :
বার্ষিক সভায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। গত ১২ অক্টোবর ‘স্মল এআই, মোর অ্যান্ড বেটার জবস’ শীর্ষক আলোচনায় বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যবহারিক ও সাশ্রয়ী এআই প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ :
বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করা, রফতানিমুখী শিল্পের বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিকাশ এখন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার।
এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে তাল মেলাতে কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো, ব্যবসা পরিচালনার বাধা কমানো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো নিশ্চিত করা এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে।
ব্যাংককে নিরাপত্তা জোরদার প্রস্তুত ১,৩০০ সিসি ক্যামেরা :
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন ঘিরে ব্যাংককে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২১টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ১ হাজার ৩০০টি সিসি ক্যামেরা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য বিক্ষোভ, ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা এবং যানজট মোকাবিলায়ও বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে ব্যাংকক মেট্রোপলিটন প্রশাসন (বিএমএ)।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় লুমফিনি পার্কের লুমফিনি রিক্রিয়েশন সেন্টারে সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানান ব্যাংককের গভর্নরের উপদেষ্টা পুলিশ জেনারেল আদিস এনগামচিতসুক্সরি।
তিনি জানান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের জন্য বিশেষ কমান্ড সেন্টার গঠন করা হয়েছে। ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্টের নির্দেশনায় নিরাপত্তার পাশাপাশি বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সম্মেলনস্থল কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারকে ঘিরে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর বিক্ষোভ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য বিএমএর কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতির আবেদন জমা পড়েনি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি